রাগ দরবারী কানাড়া । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দরবারে “রাগ দরবারী কানাড়া” (সংক্ষেপে ‘দরবারী’) কেবল একটি সুনির্দিষ্ট স্বর-বিন্যাস নয়, বরং এটি গম্ভীর পরিবেশ, রাজকীয় অভিজাত্য এবং গভীর আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্নতার এক সর্বোচ্চ অলঙ্কার। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতে একে ‘রাগেদের রাজা’ বা ‘রাজকীয় রাগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। মধ্যযুগে ভারতীয় সঙ্গীতের রূপান্তরে এবং কানাড়া অঙ্গের রাগসমূহের বিকাশে এই রাগের ভূমিকা অনন্য।

রাগ দরবারী কানাড়া

ঐতিহাসিক পটভূমি ও মিঞা তানসেনের অবদান

“কানাড়া” অঙ্গের মূল উৎস অত্যন্ত প্রাচীন। ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক অঞ্চল থেকে “কর্ণাট” বা “কানাড়া” অঙ্গের সুরকাঠামো উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে আত্মীকৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৬শ শতকে মোগল সম্রাট আকবরের রাজসভায় প্রধান সঙ্গীতসাধক মিঞা তানসেন প্রাচীন কানাড়া রাগের ওপর ভিত্তি করে ও গম্ভীর মেজাজের সংযোজন ঘটিয়ে এক নতুন সুরকাঠামো রূপদান করেন।

রাজদরবারের রাজকীয় গাম্ভীর্য, প্রশান্তি এবং মানসিক স্থৈর্য ফুটিয়ে তোলার উপযোগী করে গঠিত হয়েছিল বলেই এর নামকরণ হয় “দরবারী কানাড়া”। তানসেনের এই সৃষ্টির ফলে প্রাচীন কানাড়ার চঞ্চলতা হ্রাস পেয়ে এক ধরনের মন্থর ও গভীর আবেদন যুক্ত হয়, যা মোগল দরবারের পরিবেশকে এক অলৌকিক আবহে আচ্ছন্ন করত।

রাগ দরবারী কানাড়ার শাস্ত্রীয় পরিচয় ও রূপরেখা

সঙ্গীতশাস্ত্র অনুযায়ী, রাগ দরবারী কানাড়া আশাবরী ঠাটের অন্তর্ভুক্ত একটি অতি প্রাচীন ও প্রামাণিক রাগ। এর গঠন জটিল এবং স্বর-প্রয়োগের সূক্ষ্মতার ওপর এর পূর্ণাঙ্গ রূপ নির্ভর করে।

শাস্ত্রীয় উপাদানবিবরণ
ঠাটের নামআশাবরী
জাতিসম্পূর্ণ-ষাড়ব (আরোহণে মতান্তরে ৭টি এবং অবরোহণে ৬টি স্বরের সুনির্দিষ্ট চালচলন)
বাদী স্বরঋষভ (র)
সংবাদী স্বরপঞ্চম (প)
প্রকৃতি/ভাবঅত্যন্ত গম্ভীর, ধীরস্থির, শান্ত ও রাজকীয়
পরিবেশন কালরাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে রাত ১২টা)
প্রধান অঙ্গপূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ এবং কানাড়া অঙ্গ
ব্যবহৃত স্বরঋষভ ও পঞ্চম শুদ্ধ; গান্ধার, ধৈবত ও নিষাদ কোমল
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
দরবারী কানাড়ার স্বররূপ সরল রৈখিক নয়, বরং এটি বক্র স্বর-বিন্যাসে সমৃদ্ধ।
  • আরোহণ: ণ্ স, র জ্ঞ, র স, ম প, দ, ণ র্স
  • অবরোহণ: র্স, দ, ণ, প, ম প, জ্ঞ, র স
  • পকড় (চিহ্নিতকারী স্বরগুচ্ছ): জ্ঞ, র র, স; দ্, ণ্ স, র স; ম প জ্ঞ, র স

স্বর-প্রয়োগের সূক্ষ্মতা: আন্দোলন, মীণ্ড ও শ্রুতির গম্ভীর রূপায়ন

রাগ দরবারী কানাড়ার আত্মিক পরিচয় কেবল এর আরোহণ-অবরোহণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে স্বরের বিশেষ অলঙ্কার ও স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায়।

কোমল গান্ধার (জ্ঞ) ও কোমল ধৈবতের (দ) আন্দোলন

দরবারী কানাড়ার সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর কোমল গান্ধার এবং কোমল ধৈবতের আন্দোলন। অন্যান্য রাগে কোমল গান্ধার বা ধৈবত যেভাবে সোজা ও স্পষ্ট গাওয়া বা বাজানো হয়, দরবারীতে তা একেবারেই নিষিদ্ধ।

এখানে কোমল গান্ধার (জ্ঞ) এবং কোমল ধৈবত (দ)-এর ওপর অতি মন্থর গতিতে এক ধরনের ভারী আন্দোলন (Oscillation) সৃষ্টি করা হয়। এই আন্দোলনটি শ্রুতির অত্যন্ত নিচের ধাপে স্পর্শ করে ঋষভ বা পঞ্চমের দিকে হেলে পড়ে। এই আন্দোলন নিখুঁত না হলে দরবারী কানাড়ার প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে না এবং তা অন্য কানাড়া রাগের সাথে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মীণ্ড ও কোমল স্বরের ভারী টান

দরবারীতে ‘পঞ্চম থেকে কোমল গান্ধার’ (প ➔ জ্ঞ) এবং ‘কোমল গান্ধার থেকে ঋষভ’ (জ্ঞ ➔ র)-এর মীণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর পরিবর্তনের সময় কোনো কটু বা বিচ্ছিন্ন ধ্বনি না তুলে অত্যন্ত মসৃণভাবে এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে মীণ্ড বলা হয়। দরবারীর মীণ্ড হয় ভারী, গম্ভীর এবং অতীব নিবিড়।

মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকের আধিপত্য
এই রাগটি “পূর্বাঙ্গ প্রধান” (Saptak’s lower tetrachord-dominated)। দরবারী কানাড়ার পূর্ণবিকাশ ঘটে মন্দ্র (উদারা) এবং মধ্য (মুদারা) সপ্তকে। তার সপ্তকে (তারা) এর বিচরণ তুলনামূলকভাবে কম। উদারার খাদে যখন কোমল ধৈবত, কোমল নিষাদ এবং মন্দ্রে ঋষভ-গান্ধারের কাজ করা হয়, তখন এর গাম্ভীর্য শ্রোতার মনে এক অতল প্রশান্তি ও শ্রদ্ধা তৈরি করে।

রস, ভাব ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

রাগ শাস্ত্র মতে, প্রতিটি রাগেরই নির্দিষ্ট নান্দনিক ও মানসিক রস (Emotion) থাকে। দরবারী কানাড়া মূলত বীর রস, শান্ত রস এবং করুণ রসের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ।
  • রাজকীয় গাম্ভীর্য: এই রাগের ধীরগতি এবং ভারী তান দরবারে উপস্থিত শ্রোতার মনে এক ধরনের রাজকীয় মহিমা ও শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে।
  • ধ্যানমগ্নতা ও আক্ষেপ: এর মন্থর আন্দোলন এবং কোমল স্বরের প্রয়োগ কেবল বাইরের মহিমাকে প্রকাশ করে না, বরং এটি মানুষের অন্তর্জগতের বিরহ, গভীর চিন্তা ও ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদনের সুরকে স্পর্শ করে।

সমপ্রকৃতির রাগের সাথে বৈসাদৃশ্য ও তুলনা

কানাড়া অঙ্গের অন্যান্য রাগের সাথে দরবারী কানাড়ার পার্থক্য জানা একজন উচ্চমার্গের সঙ্গীতবোদ্ধার জন্য আবশ্যক।
দরবারী কানাড়া বনাম আদানা
রাগ আদানা এবং দরবারী কানাড়ার থাট (আশাবরী) ও স্বরসমূহ প্রায় একই হলেও তাদের প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিপরীত।
  • আদানা উত্তরঙ্গ প্রধান (তার সপ্তকে বিস্তার বেশি), অত্যন্ত দ্রুত গতিময় এবং চঞ্চল প্রকৃতির। এতে কোমল গান্ধারে কোনো আন্দোলন থাকে না এবং অবরোহণে প্রায়শই শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহৃত হয়।
  • দরবারী কানাড়া পূর্বাঙ্গ প্রধান (মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে বিস্তার), ধীরগতি সম্পন্ন এবং অত্যন্ত গম্ভীর। এতে আন্দোলন ও মীণ্ড অপরিহার্য।
দরবারী কানাড়া বনাম নায়কী ও শাহানা কানাড়া

নায়কী কানাড়ায় “ম প জ্ঞ ম র স” স্বরগুচ্ছ চঞ্চলভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর চলন মধ্য সপ্তকের ওপরের দিকে থাকে। অন্যদিকে শাহানা কানাড়া কিছুটা কোমল ও শৃঙ্গার রসপ্রধান। দরবারীর মতো এতে মন্দ্র সপ্তকের ভারী আন্দোলন ও বৈরাগ্যের ভাব অনুপস্থিত।

পরিবেশন শৈলী: ধ্রুপদ, খেয়াল ও অঙ্গ-বিস্তার

দরবারী কানাড়া পরিবেশনের জন্য গায়ক বা বাদকের উচ্চমাত্রার স্বর-নিয়ন্ত্রণ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের দক্ষতা প্রয়োজন।
  • ধ্রুপদ অঙ্গ: প্রাচীনকালে এবং মোগল দরবারে এই রাগ ধ্রুপদ ও ধামার শৈলীতে সবচেয়ে বেশি গাওয়া হতো। এর বিলম্বিত আলাপ, নোম-তোম বিস্তার এবং গুরুগম্ভীর বোলবন্টন দরবারীর মূল আত্মাকে তুলে ধরে।
  • খেয়াল অঙ্গ: আধুনিক যুগে বিলম্বিত খেয়ালে দরবারী কানাড়ার বিস্তার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অতি বিলম্বিত তালে (যেমন একতাল বা ঝুমরা) যখন মন্দ্র সপ্তকে আলাপ বিস্তার করা হয়, তখন এর পরিবেশ তৈরি হয়।
  • তানের প্রয়োগ: দরবারী কানাড়ায় দ্রুত বা চঞ্চল তান ব্যবহার করা হয় না। এতে ‘গমক তান’ এবং ‘মেড় তান’ (ভারী ও আন্দোলনযুক্ত তান) ব্যবহৃত হয়।

আধুনিক জনপ্রিয় সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র সঙ্গীতে প্রয়োগ

যদিও দরবারী কানাড়া একটি অত্যন্ত কঠিন ও শুদ্ধ শাস্ত্রীয় রাগ, তবুও ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র এবং আধুনিক সঙ্গীতে এই রাগের ব্যবহার কালজয়ী কিছু গান সৃষ্টি করেছে।
  • হিন্দী চলচ্চিত্র সঙ্গীত: নওশাদ আলীর সঙ্গীতে ও মোহাম্মদ রফির কণ্ঠে ‘বাইজু বাওরা’ (১৯৫২) চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান “ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে” রাগ দরবারী কানাড়ার ওপর ভিত্তি করে রচিত সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুর। এছাড়া ‘সীমা’ চলচ্চিত্রের “তু পেয়ার কা সাগর হ্যায়” (মান্না দে) গানটিতে দরবারীর এক অদ্ভুত শান্ত ও ভক্তিমূলক রূপ দেখা যায়।
  • বাংলা সঙ্গীত: বাংলা আধুনিক গান এবং নজরুল সঙ্গীতেও রাগ দরবারী কানাড়ার ছায়াচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে। কাজি নজরুল ইসলামের অনেক গম্ভীর ও রাগাশ্রয়ী গানে এই রাগের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।
রাগ দরবারী কানাড়া ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই অমূল্য রত্ন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার স্বকীয়তা, আভিজাত্য এবং আধ্যাত্মিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রেখেছে। শাস্ত্রীয় রূপের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্বর-প্রয়োগের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার মাধ্যমেই এই রাগের মহিমা চিরভাস্বর হয়ে থাকে।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।