সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০২৩, ৫:৪৪ পিএম

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গম্ভীর আঙিনায় কিছু রাগ থাকে, যারা কোনো নিয়ম বা শৃঙ্খলের ভারে নুয়ে পড়ে না; বরং বসন্তের দমকা হাওয়ার মতো এসে পুরো আসরকে চনমনে করে তোলে। তেমনই এক তুমুল জনপ্রিয়, প্রাণবন্ত এবং আনন্দময় রাগ হলো ‘রাগ বাহার’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি ‘কাফি’ ঠাটের অন্তর্গত একটি প্রধান রাগ। নামের মতোই এর চরিত্র—প্রকৃতিতে যখনই নতুন ঋতুর ‘বাহার’ বা উৎসব আসে, তখনই এই রাগের সুরের ডালপালা মেলতে শুরু করে। এই রাগের চলন এতটাই চটুল ও গীতিময় যে, অনেক পণ্ডিত একে খাঁটি রাগ না বলে এক প্রকারের মধুর ‘ধুন’ হিসেবেও আখ্যায়িত করতে ভালোবাসেন। এর সুরের শরীরে রাগেশ্রী, মিঞা কি মল্লার কিংবা আড়ানা রাগের এক চমৎকার ও মধুর ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যায়।
Table of Contents
রাগ বাহারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বরের জাদুকরী বৈচিত্র্য। এই রাগে ‘কোমল গান্ধার’ (জ্ঞ) এবং শুদ্ধ ও কোমল—উভয় ‘নিষাদ’ (নি) স্বরই অত্যন্ত চমত্কারভাবে ব্যবহৃত হয়। এর আরোহণে ‘ঋষভ’ (রে) স্বরটি বর্জিত থাকে বলে এটি ষাড়ব রূপ নেয়, কিন্তু অবরোহণে সব স্বর নিয়ে এটি এক পূর্ণাঙ্গ ‘ষাড়ব-সম্পূর্ণ’ রাগে পরিণত হয় (যদিও অনেক পণ্ডিতের মতে এতে ধৈবত বর্জিত থাকে)।
ঠাট: কাফি
জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ
আরোহণ: স জ্ঞ ম প, জ্ঞ ম ণ ধ ন র্স (এখানে ‘জ্ঞ’ কোমল গান্ধার, ‘ণ’ কোমল নিষাদ এবং ‘ন’ শুদ্ধ নিষাদ)
অবরোহণ: র্স ধ ণ প, ম জ্ঞ , ম র স
বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): মধ্যম (ম)। মতান্তরে ষড়জ (স)।
সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): ষড়জ (স)। মতান্তরে মধ্যম (ম)।
অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান। তবে এই রাগের ‘তারসপ্তক’ বা ওপরের দিকের স্বরগুলোর (তারস্থান) তীব্রতা ও প্রভাব থাকে অনেক প্রবল।
পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): স ম প জ্ঞ ম, ণ ধ ন র্স।
এই রাগের আরোহণের সময় ‘কোমল নিষাদ’ এবং ‘পঞ্চম’ স্বর দুটির চলন কিছুটা আঁকাবাঁকা বা বক্র প্রকৃতির হয়, যা রাগের চঞ্চলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
রাগ বাহারের আসল ম্যাজিক ও আবেদন টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য নির্দিষ্ট সময় হলো রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর বা মধ্যরাত।
তবে সময় যাই হোক, ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে এই রাগটি যেকোনো সময়েই গাওয়া যায়। চারপাশ যখন নিঝুম হয়ে আসে, ঠিক তখনই তানপুরার জাদুকরী ঝংকারে যখন বাহার জেগে ওঠে, তখন শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত তারুণ্য, আনন্দ এবং উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। এর ওপরের সপ্তকের তীব্র তানগুলো যেন প্রকৃতির বুকে নতুন পাতা গজানো আর কোকিলের কুহুতানের মতো মনকে আলোড়িত করে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাগ বাহারের এই চঞ্চল ও উৎসবমুখর প্রকৃতিকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তাই তো তাঁর বসন্ত ও প্রকৃতির বহু কালজয়ী গানে তিনি এই রাগের সুরকে পরম মমতায় বুনে দিয়েছেন। রাগ বাহারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া রবীন্দ্রনাথের কিছু অবিস্মরণীয় গান হলো:
এই গানগুলো যখনই আমাদের কানে আসে, তখন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠিন ব্যাকরণ ভুলে আমাদের মনও প্রকৃতির চিরন্তন রূপের মাঝে হারিয়ে যায়।

তথ্যসূত্র:
রাগ বিন্যাস (প্রথম কলি) — শ্রীশচীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য। এস, চন্দ্র অ্যান্ড কোং (শারদীয়া সপ্তমী, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬)।
সঙ্গীত পরিচিতি (উত্তরভাগ) — শ্রীনীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায় (৫ই ভাদ্র ‘৮০ / ২১ আগস্ট ‘৭৩)।
মন্তব্য