রাগ যোগকোষ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে কিছু রাগ আছে যেগুলো যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, আবার কিছু রাগ আছে যা গুণী সঙ্গীতজ্ঞদের সাধনা ও সৃজনশীলতায় আধুনিক যুগে তৈরি হয়েছে। তেমনই একটি চমৎকার, আধুনিক এবং মেলোডিয়াস রাগ হলো ‘রাগ যোগকোষ’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি একটি অনন্য সৃষ্টি, যা দুটি ভিন্ন রাগের মাধুর্যকে এক সুতোয় বেঁধেছে।

রাগ যোগকোষ: শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অপূর্ব আধুনিক মেলোডি

আমাদের চেনা ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের জগতে অধিকাংশ রাগের ইতিহাস শত শত বছরের পুরোনো হলেও, ‘রাগ যোগকোষ’ সঙ্গীত ইতিহাসের পাতায় তুলনামূলকভাবে নতুন একটি সংযোজন। এই রাগটি কোনো প্রাচীন পুঁথি থেকে আসেনি, বরং এটি বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত জগন্নাথ বুয়ার এক অনন্য সৃষ্টি। তিনি দুটি ভিন্ন প্রকৃতির রাগের মেলবন্ধন ঘটিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আঙিনায় এই নতুন সুরের জন্ম দিয়েছেন।

রাগের উৎস ও মিশ্রণ

রাগ যোগকোষ মূলত দুটি জনপ্রিয় রাগ—‘রাগ যোগ’ এবং ‘রাগ চন্দ্রকৌঁস’-এর এক অপূর্ব ও নান্দনিক সংমিশ্রণ। পণ্ডিত জগন্নাথ বুয়া এই দুটি রাগের চলন ও স্বরগুলোকে এমনভাবে মিলিয়েছেন, যা শ্রোতার মনে একাধারে গম্ভীর ও শান্ত এক আবহের সৃষ্টি করে।

রাগ যোগকোষ-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়ম অনুযায়ী এই রাগের মূল পরিচয় এবং গায়াকী রূপটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঠাট (Thaat): রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত।
  • জাতি (Jati): এই রাগের আরোহণ ঔড়ব (৫ স্বর) এবং অবরোহণ ষাড়ব (৬ স্বর) প্রকৃতির। অর্থাৎ, আরোহণে ঋষভ (রে) ও পঞ্চম (পা) বর্জিত এবং অবরোহণে কেবল ঋষভ (রে) বর্জিত থাকে।
  • বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো ষড়্‌জ (সা)
  • সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো মধ্যম (মা)
  • অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ (সুরের বিস্তার সপ্তকের প্রথম অংশে বেশি হয়)।
  • গাওয়ার সময় (Time): এই রাগটি পরিবেশনের আদর্শ সময় হলো রাত্রি ভাগ। গভীর রাতে এই রাগের মাধুর্য সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

রাগটিকে সঠিকভাবে চেনার এবং গাওয়ার জন্য এর স্বরলিপির চলন জানা জরুরি:

আরোহণ: দ্ণ্‌স, গস, গমধনর্স

অবরোহণ: র্স নধপম, দণদপম গমজ্ঞস

পকড় (রাগের মূল রূপ): দণদপম, গ, মজ্ঞস

(নোট: এখানে স্বরলিপির কোমল ও তীব্র রূপগুলো শাস্ত্রীয় নিয়মে উল্লেখ করা হয়েছে, যা রাগের শুদ্ধ চলন বজায় রাখতে সাহায্য করে।)

তথ্যসূত্র

এই রাগের তাত্বিক ও ক্রিয়াত্মক বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

রাগ যোগকোষ

 

রাগ যোগকোষ প্রাচীন ও আধুনিকতার এক দারুণ সেতুবন্ধন। পণ্ডিত জগন্নাথ বুয়ার এই সৃষ্টিটি প্রমাণ করে যে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চেনা নিয়মের ভেতরে থেকেও নতুন সুরের কত চমৎকার দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব। রাতের শান্ত পরিবেশে এই রাগের আলাপ বা বন্দিশ শ্রোতাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে এই তথ্যচিত্রটি আপনার কেমন লাগল তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন!

Leave a Comment