রাগ যোগ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে কিছু রাগ আছে যা তার নিজস্ব স্বরলিপির বৈচিত্র্য এবং শ্রুতিমধুরতার কারণে সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে সঙ্গীত পরিচালক—সবার কাছেই ভীষণ প্রিয়। তেমনই এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মায়াবী রাগের নাম ‘রাগ যোগ’। গভীর ভাবগাম্ভীর্য আর এক অদ্ভুত আকুলতা এই রাগের মূল বৈশিষ্ট্য, যার কারণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মঞ্চ ছাড়িয়ে রুপালী পর্দার চলচ্চিত্র সঙ্গীতেও এই রাগটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে।

রাগ যোগ: ধ্রুপদী আঙিনা থেকে রূপালী পর্দায় সাড়া জাগানো এক মায়াবী সুর

রাগ যোগ উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অন্যতম একটি জনপ্রিয় রাগ। এই রাগের সুরের মধ্যে এমন এক শান্ত ও গভীর আবেদন লুকিয়ে আছে, যা শ্রোতাকে সহজেই মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলে। এর জনপ্রিয়তার প্রমাণ মেলে আমাদের উপমহাদেশের চলচ্চিত্র সঙ্গীতে; বহু কালজয়ী গানের সুর তৈরি হয়েছে এই রাগের ওপর ভিত্তি করে।

ঠাট নিয়ে মধুর বিতর্ক

রাগ যোগের ঠাট নিয়ে সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সামান্য মতভেদ বা বৈচিত্র্য দেখা যায়। বেশির ভাগ পণ্ডিত একে খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত মনে করলেও, অনেক বিশেষজ্ঞ আবার এর স্বর বিন্যাসের কারণে এটিকে কাফি ঠাটের রাগ হিসেবেও বর্ণনা করে থাকেন। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্য রাগটিকে আরও বেশি রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

রাগ যোগ-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়ম অনুযায়ী এই রাগের মূল পরিচয় এবং গায়াকী রূপটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঠাট (Thaat): রাগটি প্রধানত খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত (তবে কাফি ঠাটের রূপভেদ হিসেবেও গণ্য করা হয়)।
  • জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-ঔড়ব। অর্থাৎ, এর আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই ৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়। এই রাগে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে।
  • বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো মধ্যম (মা)
  • Smvadi Swar (সমবাদী স্বর): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ষড়্‌জ (সা)
  • অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।

 

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

রাগ যোগকে সঠিকভাবে চেনার এবং এর চলন বোঝার জন্য এর স্বরলিপির রূপ নিচে দেওয়া হলো:

আরোহণ: স গ ম প ণ র্স

অবরোহণ: র্স ণপম গ ম সগস

পকড় (রাগের মূল রূপ): পণ্‌, সগম, সগ, স

(নোট: রাগ যোগের অবরোহণে কোমল ও শুদ্ধ গান্ধার (গা)—উভয় স্বরেরই এক চমৎকার এবং সুনিপুণ ব্যবহার দেখা যায়, যা এর মাধুর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।)

তথ্যসূত্র

এই রাগের তাত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

রাগ যোগ
রাগ যোগ

রাগ যোগ এমন এক সুরের সৃষ্টি যা খুব সহজেই মানুষের মনের ক্লান্তি দূর করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে এই রাগের বিস্তার যেমন চমৎকার শোনায়, তেমনই ছায়াছবির গানেও এর আবেদন চিরন্তন。

রাগ যোগ নিয়ে তৈরি এই সংক্ষিপ্ত সুর-চিত্রটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন! ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

Leave a Comment