উনিশ শতকের সূচনা থেকে শেষভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় যে ভাবসঙ্গীতের জন্ম হয়েছিল, তা কেবল কোনো আঞ্চলিক সাধনার স্বর ছিল না; তা ছিল বাংলা সাহিত্যের এক যুগান্তকারী সুরিক বিপ্লব। তৎকালীন গোঁড়া মুসলিম ও হিন্দু সমাজের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী প্রবৃত্তি যখন সমাজকে বিভাজিত করছিল, তখন ফকির লালন শাহ তাঁর গানে সোচ্চার করে তুলেছিলেন সর্বজনীন মানবীয় সাম্যবাদ ও আত্মতত্ত্বের দর্শন। আটপৌরে ভাষা, দৈনন্দিন জীবনের রূপক এবং ছন্দের স্বতঃস্ফূর্ততায় লালন যে সাংগীতিক আবহ সৃষ্টি করেছিলেন, তা উপরভাসা লোকসুর মনে হলেও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়—তা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথাগত কায়দা ও রাগ-বিন্যাসের সাথে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর বন্ধনে আবদ্ধ।
Table of Contents
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার: কীর্তন, পদাবলী ও রামপ্রসাদী প্রভাব
কোনো সঙ্গীতই শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। লালন শাহ্ তাঁর গান রচনার ক্ষেত্রে পূর্বসূরি বৈষ্ণব পদাবলী, শাক্ত পদাবলী এবং নদীয়ার শ্রীচৈতন্যদেবের লীলাভূমির কীর্তন ও ভজনগীতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। নবদ্বীপ ও বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্র পরিভ্রমণকালে তিনি যেসব কীর্তন ও দেহতাত্ত্বিক সুর শুনেছিলেন, সেগুলোকে নিজের ভাবাদর্শে নতুন রূপ দেন।
“রাখলেন সাঁই কূপজল করে।আঁধেলা পুকুরে ॥”
“কালার কথা কেন বল আজ আমায়।যার নাম শুনিলে আগুন জ্বলে, অংগ জ্বলে যায় ॥”
প্রথম গানটিতে ব্যথাতুর আত্মার তীব্র আকুতি প্রতিধ্বনিত হলেও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দাবির সুরে ধ্বনিত হয়। আর দ্বিতীয় গানটিতে বৈষ্ণব পদাবলীর বিরহিণী রাধার সেই চিরন্তন বিরহ রূপ নিয়েছে আধ্যাত্মিক ভাবের গভীরতায়।
“মনের হোল মতি মন্দ।তাই তো রলাম আমি জন্ম-অন্ধ ॥”
“রাসুল রাসুল বলে ডাকি।রাসুল নাম নিলে বড় সুখে থাকি ॥”
লালনগীতিতে রাগ-রাগিণীর সূক্ষ্ম প্রয়োগ
১. ভৈরবী ও শিবরঞ্জনী
“পাখি কখন জানি উড়ে যায়।বদ হাওয়া লেগে খাঁচায় ॥”
২. পুরবি ও ধানেশ্রী
“চিরদিন জল সেচিয়ে জল মানে না, এ ভাঙ্গা নায়।এক মালা জল ফেলতে গেলে তিন মালা যোগায় তে-তলায় ॥”
৩. দেবগিরি উপরাগ
“জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা।”
৪. বাগেশ্রী ও ঢিমে একতালা
“ভাবের উদয় যেদিন হবে ॥এসে হৃদয়কমলে রূপ ঝলক দিবে ॥”
৫. রাগ দেশ
“কে বোঝে কৃষ্ণের অপার লীলে।ব্রজ ছেড়ে মথুরায় কেন রাজা হ’লে ॥”
তালবিধান ও ধ্রুপদী অঙ্গের বিন্যাস
“গুরু পদে নিষ্ঠা মন যার হবে ॥যাবে রে তার সব অসুষার, अमূল্য ধন সেহি হাতে পাবে ॥”
ধ্রুপদ অঙ্গের প্রয়োগ
“আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।বাড়ির কাছে আরশীনগর, পড়শী বসত করে ॥”
সুফি ধারা: হামদ, নাত, গজল ও ‘সামা’ সঙ্গীত
“ইলাহি আলামিন আল্লা, বাদশা আলম পানা তুমি।ডুবায়ে ভাসাতে পার, ভাসায়ে কিনার দাও কারো,রাখ মার হাত তোমার, তাই তো তোমায় ডাকি আমি ॥”
“অপারের কাণ্ডারি, নবিজি আমার,ভজন-সাধন ব্যথা নবী না চিনে ॥আউয়াল আখের, বাতেন জাহের,কখন কোন রূপ ধারণ করে কোনখানে ॥”
“মুখে পড়রে সদায় লা-ইলাহা ইল্লাল্লা ॥আইন ভেজিলেন রাসুল-উল্লা ॥”
মার্গীয় মূল্যায়ন ও ভাব-সংক্ষেপ
লালনের সুর রচনার কৌশল প্রথাগত সঙ্গীতশাস্ত্রের “দাঁত-খিঁচুনি” নিয়মাবলি দিয়ে চালিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল রসধারা তাঁর গানে প্রবাহিত হয়েছে ফল্গুধারার মতো। তিনি শাস্ত্রীয় রাগের ব্যাকরণকে অন্ধভাবে অনুকরণ না করে, রাগের নান্দনিক নির্যাসকে নিজের অনুভূতির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন।
ধ্যান-গম্ভীর পরিবেশে যখন লালনের গান পরিবেশিত হয়, তখন তাতে যে সুর-সম্পদ ও ভাব-গাম্ভীর্য আত্মপ্রকাশ করে, তা স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে লালনগীতি বাংলা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অবিনশ্বর ও অবিচ্ছেদ্য শাখা। রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলগীতির মতোই লালনগীতিও ব্যাকরণসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মাধ্যমে বাংলা সঙ্গীতের দরবারে এক স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার দাবি রাখে।
১. লালনগীতি ও সুর-তাল বিশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রামাণ্য গবেষণা
- চৌধুরী, আবুল আহসান (সম্পাদিত) — লালন সমগ্র, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা।
- গোস্বামী, করুণাময় — বাংলা গানের ইতিহাস, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। (বিশেষভাবে লালনগীতি ও মার্গীয় সুরের মিথস্ক্রিয়া অনুচ্ছেদ)
- চক্রবর্তী, সুধীর — ব্রাত্য লোকায়ত লালন, পুস্তক বিপণি, কলকাতা।
- রহমান, সাঁই লুৎফর — লালন শাহের গান: সুর ও তাল বিশ্লেষণ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
- ইসলাম, সৈয়দ জহুরুল — লালনগীতির সুর ও কাব্যচিন্তা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
২. শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রাগ-রাগিণী ও লোকসঙ্গীতের সম্পর্ক
- ভট্টাচার্য, উপেন্দ্রনাথ — বাংলার বাউল ও বাউল গান, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, কলকাতা। (বাউল সুরে কীর্তন, রামপ্রসাদী ও রাগের প্রভাব আলোচনা)
- গোস্বামী, করুণাময় — সঙ্গীতকোষ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
- ভৌমিক, শক্তিপদ — বাংলা লোকসঙ্গীতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব, ফার্মা কেএলএম, কলকাতা।
৩. বৈষ্ণব পদাবলী, শাক্তগীতি ও সুফি ধারার প্রভাব
- মনসুর উদ্দীন, মুহম্মদ — হারামণি (১ম – ১৩শ খণ্ড), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
- শরীফ, আহমদ — বাউল তত্ত্ব, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী, ঢাকা।
- খান, আজাহার উদ্দীন — রামপ্রসাদ ও লালন: সুর ও ভাব তুলনা, মুক্তধারা, ঢাকা।
- হক, মুহাম্মদ এনামুল — আরাকান-রোসাঙ্গ রাজসভায় বাংলা সাহিত্য ও সুফি প্রভাব, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। (সুফি ‘সামা’ সঙ্গীত ও দেহতত্ত্বের প্রেক্ষাপট)

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।











![তত্ত্ব আমার স্বপ্ন যে সত্যি হলো [ Amar Shopno Je Sotti Holo ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/আমার-স্বপ্ন-যে-সত্যি-হলো-1024x576.webp)

