কালজয়ী সুরে আজও অমর আলম খান

‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’—বাংলা গানের ইতিহাসে এই পঙ্‌ক্তি যেন এক সুরস্রষ্টার জীবন ও সৃষ্টির প্রতিচ্ছবি। সময়ের সীমানা পেরিয়ে কিছু গান মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। প্রজন্ম বদলায়, শ্রোতার রুচিতে পরিবর্তন আসে, কিন্তু কিছু সুরের আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না। বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে তেমনই এক উজ্জ্বল নাম আলম খান। তাঁর সৃষ্ট অসংখ্য গান আজও মানুষের আবেগ, স্মৃতি, ভালোবাসা ও বিরহের সঙ্গে মিশে আছে।

কখনো নদীর ঢেউয়ের মতো বয়ে এসেছে তাঁর সুরে বিচ্ছেদের আকুলতা, কখনো জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ফুটে উঠেছে সহজ অথচ গভীর কথায়। আবার কখনো প্রেমের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে রজনীগন্ধার সুবাসের মতো কোমল সংগীতে। বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি শ্রোতাদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অনুভূতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টি। এ কারণেই তিনি কেবল একজন সংগীত পরিচালক নন, বরং বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের স্মরণীয় এক সুরকার।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

আলম খানের পুরো নাম খুরশিদ আলম খান। ১৯৪৪ সালের ২২ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের বানিয়াগাথি গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা আফতাব উদ্দিন খান এবং মা জোবেদা খানম। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। সেই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাঁকে পেশাদার সংগীতের জগতে নিয়ে আসে।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পপসংগীতের কিংবদন্তি আজম খানের বড় ভাই। দুই ভাইয়ের সংগীতের ধরন ও কাজের ক্ষেত্র এক ছিল না। আজম খান পপসংগীতে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তোলেন, অন্যদিকে আলম খান বাংলা চলচ্চিত্রের গানে নিজের সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রাখেন। ভিন্ন ধারায় কাজ করলেও বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতের ইতিহাসে দুজনের অবদানই বিশেষভাবে স্মরণীয়।

গুলবানু খানের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে আলম খানের দুই ছেলে—আরমান খান ও আদনান খান এবং এক মেয়ে—আনিকা খান। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি নিজের কাজের মধ্য দিয়ে যে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন, তা তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

চলচ্চিত্রের সংগীতে পথচলা

আলম খানের পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা ঘটে ১৯৭০ সালে। আবদুল জব্বার খান পরিচালিত কাঁচ কাটা হীরে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। সেই শুরু থেকে দীর্ঘ কয়েক দশকের পথচলায় বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতে অসংখ্য স্মরণীয় গান উপহার দিয়েছেন এই সুরস্রষ্টা।

তাঁর সুরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বৈচিত্র্য ও আবেগের স্বাভাবিক মেলবন্ধন। লোকজ সংগীতের মাটির গন্ধ, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনুভূতিকে তিনি নিজের মতো করে সুরে রূপ দিতেন। প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা কিংবা জীবন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি—বিভিন্ন আবেগকে সংগীতে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য।

চলচ্চিত্রের গল্প ও দৃশ্যের সঙ্গে গানের আবেগের সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টিও তাঁর সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি গান কীভাবে চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করবে, গল্পের আবহকে গভীর করবে কিংবা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে তাঁর সংগীত পরিচালনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

তাঁর অনেক গান চলচ্চিত্রের পর্দা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ এসব গানের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন প্রেমের স্মৃতি, কেউ বিচ্ছেদের বেদনা, আবার কেউ জীবনের কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন। এভাবেই তাঁর সৃষ্টি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

যে গানগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে

আলম খানের সুরারোপিত জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ওরে নীল দরিয়া, হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস এবং আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই। এসব গান শুধু জনপ্রিয়তার জন্য নয়, কথার সঙ্গে সুরের গভীর সম্পর্ক এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষমতার কারণেও শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ওরে নীল দরিয়া গানে ফুটে ওঠে আকুলতা, দূরত্ব ও অজানার দিকে ছুটে চলা এক বিষণ্ন হৃদয়ের অনুভূতি। এর সুর শ্রোতাকে এমন এক আবেগের জগতে নিয়ে যায়, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে গানের আবেদন মিশে যায়।

অন্যদিকে, হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষের বাহ্যিক জৌলুশ, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনিবার্য বাস্তবতাকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করেছে গানটি। এর কথার সরলতা এবং অন্তর্নিহিত জীবনবোধ গানটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।

আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই গানে ভালোবাসা ও মমতা ছড়িয়ে দেওয়ার এক কোমল অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। রজনীগন্ধার সুবাসের উপমা গানটির আবেগকে আরও অর্থবহ করে তোলে। এই পঙ্‌ক্তি যেন আলম খানের নিজের সৃষ্টিশীল জীবনেরও প্রতীক—তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সুরের সুবাস রয়ে গেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে—

  • ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ — বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও গভীর আবেগের প্রকাশ।

  • ‘ভালবেসে গেলাম শুধু’ — না-পাওয়ার বেদনা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অনুভূতি।

  • ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’ — প্রিয় মানুষের অনন্যতাকে ঘিরে রোমান্টিক আবেগ।

  • ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’ — প্রিয়জনকে কাছে না পাওয়ার আকুলতা।

  • ‘তেল গেলে ফুরাইয়া’ — সহজ কথায় জীবনের বাস্তবতা ও লোকজ জীবনবোধ।

  • ‘আমি তোমার বধূ, তুমি আমার স্বামী’ — দাম্পত্যের ভালোবাসা ও সম্পর্কের মাধুর্য।

  • ‘জীবনের গল্প বাকি আছে অল্প’ — সময়ের প্রবাহ ও জীবনের সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি।

এ ছাড়া মনে বড় আশা ছিল, সাথীরে যেও না কখনো দূরে, বেলি ফুলের মালা পরে, কাল তো ছিলাম ভালো, চুমকি চলেছে একা পথে এবং তুমি কি এখন আমারই কথা ভাবছো গানগুলোও শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে।

এসব সৃষ্টির আবেদন শুধু সুরের মাধুর্যে সীমাবদ্ধ নয়। গানগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্মরণীয় সময়, মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং কয়েক প্রজন্মের আবেগের ইতিহাস। পুরোনো দিনের গান শুনতে গিয়ে অনেকেই ফিরে পান ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি। আলম খানের সুরের স্থায়িত্বের পেছনে এই আবেগের সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও স্বীকৃতি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংগীতে অবদানের জন্য আলম খান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ সুরকার বিভাগে একাধিকবার সম্মানিত হন। তাঁর জীবনীতে এই দুই বিভাগ মিলিয়ে সাতবার পুরস্কার পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘদিনের সাধনা, সৃজনশীলতা ও সংগীত পরিচালনায় দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবেই এসব অর্জন গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনো শিল্পীর অবদান শুধু পুরস্কার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাঁর প্রকৃত সার্থকতা অনেক সময় ধরা পড়ে সৃষ্টির স্থায়িত্বে। যে গান একসময় চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল, সেটি যদি বহু বছর পরও শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তবে তা শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার বড় প্রমাণ।

আলম খানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। তাঁর অনেক গান এখনো শ্রোতাদের পরিচিত এবং আবেগের সঙ্গে যুক্ত। সংগীতের ভাষায় বৈচিত্র্য বজায় রেখেও জনপ্রিয়তা অর্জন করা তাঁর অন্যতম সাফল্য। তিনি এমন সব সুর তৈরি করেছিলেন, যা চলচ্চিত্রের গল্পকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি স্বতন্ত্র গান হিসেবেও শ্রোতার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান তাই কেবল জনপ্রিয় কয়েকটি গানের সুরকার হিসেবে নয়; বরং আবেগ, শ্রুতিমাধুর্য ও গল্পের প্রয়োজনকে একসূত্রে বাঁধতে পারা একজন দক্ষ সংগীত পরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনের শেষ অধ্যায়

দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করলেও জীবনের শেষদিকে শারীরিক জটিলতার মুখোমুখি হন আলম খান। ২০১১ সালে তাঁর ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আরও কয়েক বছর অতিবাহিত করেন তিনি।

অবশেষে ২০২২ সালের ৮ জুলাই ঢাকার একটি হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে নেমে আসে শোক। একজন সুরকারের চলে যাওয়া মানে শুধু একজন শিল্পীর অনুপস্থিতি নয়; তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি ও সৃষ্টির ইতিহাসও নতুন করে স্মরণ করার উপলক্ষ তৈরি হয়।

আলম খানের ক্ষেত্রেও তাঁর মৃত্যুর পর শ্রোতাদের কাছে ফিরে এসেছে তাঁর সৃষ্টির কথা। তাঁর গানগুলো আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সংগীতের স্থায়িত্ব শিল্পীর জীবদ্দশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

সুরের মৃত্যু নেই

মানুষের জীবন একসময় থেমে যায়, কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষের শিল্প অনেক সময় তাঁর জীবনের সীমানা পেরিয়ে বহুদূর এগিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে অনেক ঘটনা বিস্মৃত হয়, পুরোনো স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসে; তবু কিছু গান মানুষের মনে থেকে যায় অমলিন।

আলম খান তেমনই একজন সুরস্রষ্টা। তাঁর সৃষ্ট ওরে নীল দরিয়া যখন কোনো শ্রোতার মনে বিরহের অনুভূতি জাগায়, হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস যখন জীবনের অনিশ্চয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়, কিংবা আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই যখন ভালোবাসার কোমল অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়, তখন তাঁর সুর নতুন করে ফিরে আসে মানুষের কাছে।

একজন সংগীতকারের বড় অর্জন হলো এমন সৃষ্টি রেখে যাওয়া, যা সময়ের পরিবর্তনেও আবেদন হারায় না। আলম খানের গান সেই স্থায়িত্বেরই উদাহরণ। তাঁর সুরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্মরণীয় অধ্যায়, জনপ্রিয় সংগীতের বিকাশ এবং অসংখ্য শ্রোতার ব্যক্তিগত অনুভূতি।

আজ তাঁর জন্মদিনে এই কিংবদন্তি সুরস্রষ্টার প্রতি জানানো হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতে তাঁর অবদান স্মরণ করতে গিয়ে ফিরে দেখতে হয় সেই গানগুলোকে, যেগুলো একসময় মানুষের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়েছে এবং আজও নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

আলম খান নেই, কিন্তু তাঁর সুর রয়ে গেছে। রজনীগন্ধার সুবাসের মতোই তাঁর সৃষ্টির সৌরভ ছড়িয়ে থাকুক বাংলার ঘরে ঘরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তাঁর গান বেঁচে থাকুক মানুষের স্মৃতিতে, অনুভবে ও ভালোবাসায়—দীর্ঘকাল।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।