যাবি যেদিন শশান ঘাটে – পরীক্ষিৎ বালা | Jabi Jedin Sosan Ghate – Parikshit Bala

বাংলা লোকসংগীতের সমৃদ্ধ দেহতত্ত্ব ও শ্মশান-বৈরাগ্য ধারার এক গভীর মর্মস্পর্শী গান “যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে”। জনপ্রিয় লোক ও ভক্তিমূলক সংগীতশিল্পী পরীক্ষিত বালার ভরাট, দরদি ও ভাবগম্ভীর কণ্ঠে গানটি বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সঞ্চার করেছে। পার্থিব ধন-সম্পদ, পারিবারিক বন্ধন এবং অহংকারের ক্ষণভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে মৃত্যুর অনিবার্য সত্য ও মানবজীবনের চরম পরিণতিকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল লোকজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে এই গানে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামযাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে (বাঁশের দোলায় চড়ে)
মূল কণ্ঠশিল্পীপরীক্ষিত বালা
সংগীতধারালোকসংগীত / দেহতত্ত্ব ও শ্মশান-বৈরাগ্য ভাবগীতি
সুরশৈলীকীর্তনাঙ্গ ও ভাটি সুরের মেলবন্ধন
মূল উপজীব্যজীবনের নশ্বরতা, পার্থিব অহংকারের অসারতা, সম্পর্কের মায়া ও অন্তিম সত্য
প্রতীক ও রূপকহাতির দাঁতের পালঙ্ক বনাম বাঁশের দোলা, তিল-কড়ি-তুলসীপাতা, মুখাগ্নি
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটআবহমান বাংলার লোকায়ত মরমি ও ভক্তিবাদী ধারা

যাবি যেদিন শশান ঘাটে লিরিক্স

হাতির দাঁতের পালঙ্ক তোর,রইবে খালি পড়ে।

যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে,বাঁশের দোলায় চড়ে।।

সঙ্গে দিবে এক মুঠো তিল,গোটা কয়েক কড়ি,

দুই চোখে তুলসী পাতা,সঙ্গে মাটির হাড়ি।।

পরনের ঐ দামি কাপড়,নেবে সেদিন কেড়ে।।

যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে,বাঁশের দোলায় চড়ে।।

যে ছেলেটি প্রথম তোকে,ডেকেছিল পিতা,

শ্মশান ঘাটে সেই ছেলেই তো,জ্বালবে রে তোর চিতা।।

পুড়বে রে তোর সাধের দেহ,কর্ম রবে পরে।।

যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে,বাঁশের দোলায় চড়ে।।

পরকে আপন ভেবে রে তুই,বাঁধলি সুখের ঘর,

দয়ালই তোর পরম আপন,আর তো সবি পর।।

অন্তিমকালে হরি বলে,ডাক্ রে সকল ছেড়ে।।

যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে,বাঁশের দোলায় চড়ে।।।

 

Jabi Jedin Sosan Ghate Lyrics in english

Haatir Danter… Palonko Tor..
Roibe Khali Pore..

Jabi Jedin Sosan Ghate..
Bansher Dolay Chore [x2]

Songey debe ek mutho tiil
Gota-koyek kori..
Dui chokhe tuloshi paata
Songee matir haari [x2]

Poroner-oi daami kapor
nebe sedin kere.. [x2]
Jabi Jedin Soshan Ghate..
Basher Dolay Chore

Je cheleti prothom toke
deke chilo pita..
Soshan ghate sei cheleto
jalbe-re tor chita [x2]

Purbe re tor sadher deho
kormo robe porey.. [x2]

Jaabi Jedin Soshan Ghate..
Basher Dolay Chorey [x2]

Por-ke apon vebe re tui
badhli sukher ghor..
Doyale tor porom apon
aar-to shobi por.. [x2]

Ontim kale hori bole
daakre shokol chere.. [x2]

Jaabi Jedin Soshan Ghatey..
Basher Dolay Chore [x3]

গানের মূল ভাব

“যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে” গানটির মূল নির্যাস হলো মানবজীবনের চরম সত্য—মৃত্যুচেতনা এবং সংসার-মোহের অন্তর্নিহিত শূন্যতা। মানুষ আজীবন অর্থ, প্রতিপত্তি, দামি আসবাব এবং পরিবারের মায়ায় মগ্ন থেকে আত্মশুদ্ধির পথ ভুলে থাকে। অথচ মৃত্যুর পর এই সমস্ত জাগতিক বৈভব সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

গানটিতে এক তীব্র মানসিক বৈপরীত্যের ওপর আলো ফেলা হয়েছে। জীবিতাবস্থায় যে দেহকে অগাধ স্নেহে ও বিলাসে লালন-পালন করা হয়, অন্তিমে সেই দেহকেই বাঁশের দোলায় তুলে শ্মশানে চিতায় ভস্ম করে দেওয়া হয়। সংসারের রক্তমাংসের প্রিয়জনেরা একসময় পর হয়ে যায়; কেবল মানুষের কৃতকর্ম এবং পরমাত্মা বা হরির নামই শেষযাত্রার একমাত্র সম্বল হয়।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. বৈভব বনাম অন্তিম রিক্ততার বৈপরীত্য

  • “হাতির দাঁতের পালঙ্ক তোর, রইবে খালি পড়ে / যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে, বাঁশের দোলায় চড়ে…”
    গানটির সূচনাতেই চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। বিত্তের চরম প্রতীক ‘হাতির দাঁতের পালঙ্ক’ ছেড়ে মানুষকে শেষযাত্রায় একটি সাধারণ ‘বাঁশের দোলা’য় (খাট বা মাচা) চড়ে শ্মশানে যেতে হয়। জাগতিক সব আভিজাত্য নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

২. শেষযাত্রার নিঃস্বতা ও লৌকিক আচার

  • “সঙ্গে দিবে এক মুঠো তিল, গোটা কয়েক কড়ি / দুই চোখে তুলসী পাতা, সঙ্গে মাটির হাঁড়ি / পরনের ঐ দামি কাপড়, নেবে সেদিন কেড়ে…”
    হিন্দু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বাস্তব আচারগুলো এখানে কাব্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। জীবনের শেষলগ্নে মানুষের সাথে কেবল তিল, কড়ি আর মাটির হাঁড়ি ছাড়া আর কিছুই থাকে না। এমনকি গায়ের দামি বস্ত্রটুকুও কেড়ে নিয়ে কাফন বা সাধারণ কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

৩. সম্পর্কের মোহভঙ্গ ও চিতার অনল

  • “যে ছেলেটি প্রথম তোকে, ডেকেছিল পিতা / শ্মশান ঘাটে সেই ছেলেই তো, জ্বালবে রে তোর চিতা / পুড়বে রে তোর সাধের দেহ, কর্ম রবে পড়ে…”
    পারিবারিক সম্পর্কের চূড়ান্ত নির্মমতা ও স্বাভাবিক রূপটি এখানে প্রকাশিত। যে সন্তানকে পরম স্নেহে বড় করা হয়েছে, লৌকিক বিধানে সেই সন্তানই পিতার মুখে আগুন (মুখাগ্নি) দিয়ে চিতা প্রজ্বলন করে। সমস্ত দেহ ছাই হয়ে গেলেও জগতে কেবল মানুষের কর্মের স্মৃতি বেঁচে থাকে।

৪. মায়ামুক্তির ডাক ও পরম শরণ

  • “পরকে আপন ভেবে রে তুই, বাঁধলি সুখের ঘর / দয়ালই তোর পরম আপন, আর তো সবি পর / অন্তিমকালে হরি বলে, ডাক্ রে সকল ছেড়ে…”
    গানটির সমাপ্তি ঘটে এক বৈরাগ্যময় আহ্বানের মধ্য দিয়ে। অনিত্য সংসারের মিথ্যা মায়ায় না ভুলে একমাত্র অন্তর্যামী পরমাত্মার স্মরণে নিজেকে সঁপে দেওয়াই জীবের আসল কর্তব্য।

সাহিত্যিক ও দার্শনিক বৈশিষ্ট্য

  • শ্মশান-বৈরাগ্যের প্রকাশ: মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলিতে যে দেহতত্ত্ব ও জীবনের নশ্বরতার দর্শন পাওয়া যায়, এই গানে সেই চিরন্তন ভাবটি সহজিয়া মেঠো সুরে সংহত হয়েছে।
  • চিত্রকল্পের তীক্ষ্ণতা (Poignant Imagery): ‘দামি কাপড় কেড়ে নেওয়া’, ‘মাটির হাঁড়ি’, এবং ‘সন্তানের চিতা জ্বালানো’র মতো জীবন্ত দৃশ্যকল্পগুলো মানুষের অন্তরে তীব্র মোহভঙ্গের আলোড়ন সৃষ্টি করে।
  • সরল ছন্দ ও অন্ত্যমিল: জটিল অলংকার এড়িয়ে প্রত্যহ ব্যবহারের গ্রামীণ পদাবলির গাঁথুনি গানটিকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলেছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কীর স্বকীয়তা

  • পরীক্ষিত বালার কণ্ঠমাধুর্য: পরীক্ষিত বালার গায়কীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সুরের ভেতর আধ্যাত্মিক আর্তি ও বৈরাগ্যের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা। তাঁর গমগমে অথচ আবেগঘন স্বরপ্রক্ষেপণ গানের প্রতিটি বাক্যকে প্রাণবন্ত করে।
  • কীর্তনাঙ্গ লোকসুর: খোল, করতাল, হারমোনিয়াম ও দোতারার সহযোগে ধীর-মধ্যম লয়ে গানটি পরিবেশিত হয়। সুরের এই উদাসী চলন মানবমনে শান্ত অথচ গভীর বৈরাগ্যময় পরিবেশ তৈরি করে।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

বাঙালির চিরায়ত লোকসংস্কৃতিতে মৃত্যু কোনো ভয়ের বিষয় নয়, বরং তা জীবনের অনিবার্য সমাপ্তি ও পরম সত্য। লালন সাঁই, হাসন রাজা কিংবা শীতালং শাহের মতো মরমি কবিরা বারবার যে দেহতত্ত্বের বার্তা দিয়েছেন, পরীক্ষিত বালার “যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে” গানটি সেই ঐতিহ্যেরই এক আধুনিক লোকায়ত ধারাবাহিকতা। গ্রামীণ কীর্তনের আসর, সাধুসঙ্গ এবং ভক্তিসংগীতের আসরে এই গান আত্মোপলব্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে সমাদৃত।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. বাংলার লোকসংগীত ও দেহতত্ত্ব পদাবলী সংকলন।
  2. পরীক্ষিত বালা অফিসিয়াল ভক্তিমূলক ও লোকগীতি অডিও আর্কাইভ।
  3. লোকায়ত মৃত্যুচেতনা ও শ্মশানতত্ত্ব, বাংলা সংস্কৃতি গবেষণা সেল।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।