বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য ) । বাঙালি বেতার সম্প্রচারক, গীতিকার, প্রযোজক ও নাট্য পরিচালক

বাঙালি সনাতনীদের কাছে মহালয়ার ভোর মানেই এক অলৌকিক নস্টালজিয়া। শরতের সেই আবছা আলো-অন্ধকারে রেডিওর নব্ ঘুরিয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ আর পঙ্কজ মল্লিকের সুরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ না শুনলে বাঙালির পুজো শুরুই হয় না। কিন্তু এই কালজয়ী সৃষ্টির পেছনে যিনি মূল স্থপতি—যাঁর কলম থেকে বেরিয়েছিল আস্ত এই গীতালেক্ষ্য, তিনি বড় অদ্ভুতভাবে লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গেলেন। তিনি বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য, তবে সৃষ্টিশীল ভুবন তাঁকে চেনে ‘বাণীকুমার’ নামে। পঙ্কজকুমার মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের এই সমসাময়িক মানুষটি স্রেফ নিজের মেধা আর জেদ দিয়ে বাঙালির সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অমর মহাকাব্য লিখে গেছেন।

বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য ) । বাঙালি বেতার সম্প্রচারক, গীতিকার, প্রযোজক ও নাট্য পরিচালক

শৈশব ও মেধার উন্মেষ

১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর হাওড়ার কানপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম নেন বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। পিতা বিধুভূষণ ভট্টাচার্য ছিলেন একজন নামী সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ, আর মা অপর্ণা ভট্টাচার্য। তাঁদের চার ভাই-বোনের মধ্যে বৈদ্যনাথ ছিলেন সবার বড়। তাঁদের আদি নিবাস ছিল হুগলির আঁটপুরে।

হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার শুরু। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বিখ্যাত কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়কে। স্যারের উৎসাহেই কিশোর বৈদ্যনাথের ভেতরে প্রথম কবিতা রচনার বীজ বোনা হয়। স্কুল শেষ করে তিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ইংরেজিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। তবে শুধু ইংরেজি নয়, পরিবারে সংস্কৃত চর্চার ঐতিহ্য থাকায় সংস্কৃতেও তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। এই পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ‘কাব্যসরস্বতী’ উপাধিও পেয়েছিলেন।

গার্স্টিন প্লেস ও বাণীকুমারের জন্ম

সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে উচ্চশিক্ষা আর বেশিদূর এগোয়নি। বাধ্য হয়ে কলকাতার টাঁকশালে (মিণ্ট) একটা চাকরি নেন তিনি। কিন্তু যাঁর মগজে দিন-রাত শিল্পের পোকা নড়াচড়া করে, তাঁর কি আর সরকারি কেরানিগিরিতে মন বসে?

১৯২৭ সাল। ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসে এক বেসরকারি উদ্যোগে সবেমাত্র মাথা তুলছে কলকাতা বেতারকেন্দ্র (আজকের আকাশবাণী)। তৎকালীন ভারতীয় অনুষ্ঠান বিভাগের অধিকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের ডাকে সেখানে একে একে জড়ো হচ্ছেন রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজকুমার মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মতো তরুণ তুর্কী দল। এই সৃজনশীল আবহের টানে বৈদ্যনাথ টাঁকশালের নিরাপদ চাকরি এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে বেতারকেন্দ্রে ‘রাইটার স্টাফ আর্টিস্ট’ হিসেবে যোগ দেন। আর এই বেতারের আঙিনাতেই বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য নাম বদলে হয়ে ওঠেন ‘বাণীকুমার’।

একটি লড়াই এবং ইতিহাস সৃষ্টি

১৯৩৪ সালের ৮ অক্টোবর (১৩৪১ বঙ্গাব্দ)। মহালয়ার সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা। রেডিওতে প্রথম প্রচারিত হলো ঐতিহাসিক এক অনুষ্ঠান—‘মহিষাসুরমর্দিনী’। গ্রন্থনা ও চণ্ডীপাঠে ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কিন্তু অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হতেই তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ও কট্টরপন্থীদের বুক কেঁপে উঠল। চারিদিকে তীব্র আপত্তির ঝড়—‘এক অব্রাহ্মণ কায়স্থের ছেলে কেন চণ্ডীপাঠ করবে?’

ধর্মের এই গোঁড়ামির মুখে সেদিন প্রাচীরের মতো রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বাণীকুমার। কারণ তিনিই ছিলেন এই অনুষ্ঠানের মূল রচয়িতা ও প্রবর্তক। সমস্ত চাপ উপেক্ষা করে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রই চণ্ডীপাঠ করবেন, অন্য কেউ নয়। বাণীকুমারের সেই অনড় সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই সেদিন তৈরি হয়েছিল ইতিহাস, যা আজ প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঙালির সবচেয়ে বড় আবেগ হয়ে টিকে আছে।

অন্তরালের সাহিত্যিক ও বহুমুখী প্রতিভা

বাণীকুমারকে আমরা শুধু মহালয়ার গান দিয়ে মনে রাখলেও, বেতার নাটক এবং চলচ্চিত্রের গীতি-রচনায় তাঁর অবদান ছিল আকাশচুম্বী। ‘ভাগ্যচক্র’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘রূপলেখা’ ও প্রমথেশ বড়ুয়ার কালজয়ী ‘দেবদাস’ ছবির বহু বিখ্যাত গান তাঁরই লেখা। ১৯৪১ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ‘ওমর খৈয়াম’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম বেতার নাট্যরূপ দিয়েছিলেন বাণীকুমার। নজরুলের সাথে তাঁর হৃদ্যতা ছিল দেখার মতো। অন্যদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর ধ্যানের ধন; কবিগুরুর বহু কবিতার সার্থক নাট্যরূপ তিনি বেতারে পরিবেশন করেছিলেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সন্তান’, ‘সপ্তর্ষি’, ‘গীতবল্লকী’, ‘কথা-কথালি’, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, ‘রায়বাঘিনী’, এবং দুই খণ্ডের ‘স্বরলিপিকা’ অন্যতম। এমনকি ইতিহাস নিয়ে তাঁর আগ্রহ থেকে লিখেছিলেন ‘হাওড়া হুগলীর ইতিহাস’।

ছেলের চোখে বাবা: কিছু ফেলে আসা স্মৃতি

বাণীকুমারের জ্যেষ্ঠ পুত্র নৃসিংহকুমার ভট্টাচার্য (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত মনোবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক) বাবার জীবনের বহু অজানা গল্প শোনান। বাবার রাখা বিরল নামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁর দুই দিদির নাম অরুণলেখা ও সোমলেখা। এই নাম দুটি পঙ্কজকুমার মল্লিকের এত পছন্দ হয়েছিল যে, বাণীকুমারের বড় দিদির নামানুসারেই পঙ্কজবাবু নিজের মেয়ের নাম রেখেছিলেন।

বাগবাজারের তেলিপাড়ার যে বাড়িতে বাণীকুমার তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো (১৯৯১ সাল পর্যন্ত) কাটিয়েছেন, সেটি আজ আর নেই। উত্তর কলকাতার সেই সাবেকি বাড়ি ভেঙে আজ ফ্ল্যাটবাড়ি হয়েছে। অধ্যাপক নৃসিংহবাবু এখন থাকেন কেষ্টপুরে। তাঁর বসার ঘরের একতলায় আজও সযত্নে রাখা আছে বাবার সেই কাঠের বড় লেখার টেবিল, চেয়ার, আলমারি আর আলমারি ঠাসা দুর্লভ বইয়ের গন্ধ।

নৃসিংহবাবুর সংগ্রহে আজও বেঁচে আছে ইতিহাস। বাবার পকেটঘড়ি, হাতঘড়ি, হরেক রকমের ফাউন্টেন পেন, পানদানি, জর্দাদানি, চশমা, এমনকি ৫০ বছর আগে শ্যামবাজার থেকে বাগবাজার যাওয়ার বাবার সেই পুরনো ট্রামের মাসিক টিকিটটি—যেখানে জ্বলজ্বল করছে তাঁর আসল নাম, ‘বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য’।

বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য ) । বাঙালি বেতার সম্প্রচারক, গীতিকার, প্রযোজক ও নাট্য পরিচালক
বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য )

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বা পঙ্কজ মল্লিকের তুলনায় বাণীকুমার প্রচারের আলোয় একটু কমই এসেছেন। তবে নৃসিংহবাবুর কথায়, “এ রকম তুলনার কোনো অর্থ হয় না। বাণীকুমার বাণীকুমারই। বাংলা সংস্কৃতির সাথে তাঁরা সবাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন।”

আজ তাঁর জন্মস্থান হাওড়া এবং কর্মক্ষেত্র কলকাতায় তাঁর মূর্তি বসেছে। কিন্তু বাণীকুমারের আসল মূর্তিটি খোদাই করা আছে প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে কোটি কোটি বাঙালির অবচেতন মনে। তিনি প্রচারের আলো চাননি, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির আকাশে তিনি এমন এক শরতের মেঘ রেখে গেছেন, যা কোনোদিন ফিকে হওয়ার নয়।

Leave a Comment