২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে হুট করেই একটা বড়সড় মিউজিক্যাল শিফট বা পরিবর্তন এসেছিল। গতানুগতিক মেলোডি বা চেনা পপ ঘরানার বাইরে গিয়ে হিপহপ, ইলেকট্রনিকা, আর লোকজ সুরের সাথে ওয়েস্টার্ন বিটের এক অদ্ভুত ও জাদুকরী মেলবন্ধন ঘটেছিল। আর এই পুরো বিপ্লবের পেছনে যিনি মূল কারিগর ছিলেন, তিনি ফুয়াদ আল মুকতাদির। স্রেফ নিজের সাউন্ড সেন্স আর রি-মিক্সিংয়ের অভিনব চাতুরী দিয়ে তিনি তরুণ প্রজন্মকে নতুন করে বাংলা গান শুনতে বাধ্য করেছিলেন। গায়ক, সুরকার কিংবা সঙ্গীত পরিচালক—যে নামেই তাঁকে ডাকা হোক না কেন, ফুয়াদ মানেই ছিল অডিও বাজারে সুপারহিট এক ট্রেন্ড।
Table of Contents
ফুয়াদ আল মুকতাদির । বাঙালি গায়ক, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক

দেশান্তর এবং জ্যামিংয়ের দিনগুলো
ফুয়াদের সঙ্গীতের ভিতটা কিন্তু তৈরি হয়েছিল সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৮৮ সালে, মাত্র আট বছর বয়সে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুলজীবন শুরু হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি চব্বিশ ঘণ্টা যাঁর মাথায় সুর ঘুরত, তাঁর পক্ষে গান থেকে দূরে থাকা অসম্ভব ছিল।
অবশেষে ১৯৯৩ সালে মধু, হিমেল, শুমন এবং ফ্রেডকে সাথে নিয়ে ফুয়াদ গড়ে তোলেন তাঁর প্রথম ব্যান্ড দল “যেফির” (Zephyr)। ১৯৯৯ সালে ব্যান্ডটি ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁরা বেশ কিছু দারুণ গান রেকর্ড করেছিলেন। আমেরিকার নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালিদের জন্য সে সময় তাঁরা ‘মায়া’ এবং ‘মায়া ২’ নামে দুটি চমৎকার অ্যালবামও প্রকাশ করেন।
ইন্ডাস্ট্রিতে ঝড় এবং ‘রি-ইভোল্যুশন’
ব্যান্ড ভেঙে যাওয়ার পর ফুয়াদ এককভাবে কাজ শুরু করেন। আর তাঁর এই পথচলায় মস্ত বড় বাঁক এনে দেয় ‘রি-ইভোল্যুশন’ অ্যালবামটি। ‘অবস্কুর’ ব্যান্ডের বিখ্যাত কীবোর্ড বাদক সোহেল আজিজের সহায়তায় বের হওয়া এই অ্যালবামটি বাংলা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এক সত্যিকারের রেভোল্যুশন বা বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
১৪টি গানের এই অ্যালবামে মৌলিক গানের পাশাপাশি ফুয়াদ কিছু কালজয়ী গানকে একদম নতুন সাউন্ডে রিমিক্স করেছিলেন। লিটুর কণ্ঠে “সিলতি”, অনীলা নাজ চৌধুরীর মায়াবী কণ্ঠের “ঝিলমিল”, আর আরমিন মুসার “ভ্রমর কইয়ো” কিংবা “মন চাইলে মন” গানগুলোর নতুন রূপ রাতারাতি শ্রোতাদের মাঝে তুমুল ঝড় তোলে।
এরপর ২০০৬ সালে বাজারে আসে তাঁর প্রোডাকশন ‘ভ্যারিয়েশন নং. ২৫’। এই অ্যালবামের তুমুল জনপ্রিয়তার পর জি-সিরিজ ও আরশির ব্যানারে আরও দুটি নতুন গান যোগ করে ‘ভ্যারিয়েশন নং. ২৫.২’ নামে এটি পুনরায় রিলিজ করা হয়। পুনমের গাওয়া “নবীনা”, রাজিব ও ফুয়াদের কণ্ঠে নতুন ঘরানার “নিটোল পায়ে” কিংবা বাপ্পা মজুমদারের “কোন আশ্রয়” গানগুলো এই অ্যালবামেরই সম্পদ।
‘বন্য’ উন্মাদনা ও অন্যান্য কোলাবোরেশন
২০০৭ সালের ২০ জুলাই ফুয়াদের মিউজিক্যাল ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক ‘বন্য’ অ্যালবামটি প্রকাশ পায়। এই অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাক—উপলের গাওয়া “তোর জন্য আমি বন্য” তখন প্রতিটি তরুণ-তরুণীর মুখে মুখে ফিরত। এছাড়া “বন্য র্যাপ”, “জংলী”, “দা-দুষ্টু নাম্বার” এবং “নিটোল পায়ে” গানের লাইভ সংস্করণটি অ্যালবামটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এর পরপরই ফুয়াদ একের পর এক সফল কোলাবোরেশন করতে থাকেন। সুমন ও অনীলা’র যৌথ অ্যালবাম ‘এখনো আমি’, ব্যান্ড ‘যাত্রী’র তপুর কণ্ঠে “বন্ধু হবে কি?”, কিংবা কনা, মালা ও মিলার সাথে তাঁর ফিচারিং অ্যালবাম ‘রি-ডিফাইন্ড’ বাংলা গানের চেনা খোলনলচে বদলে দেয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বিভিন্ন গুণী ও নতুন শিল্পীদের নিয়ে তিনি নিয়ে আসেন মিক্সড অ্যালবাম ‘ক্রমান্বয়’। শেরিন, অনীলা, সুমন বা তপুর মতো শিল্পীদের একক ও মিক্সড অ্যালবামের পেছনের মূল জাদুকর ছিলেন এই ফুয়াদই।
ফুয়াদের অ্যালবাম প্রোফাইল
তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিন থেকে গোল্ডেন এরা-র কিছু উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম একনজরে:
- মায়া (১৯৯৮)
- মায়া ২ (১৯৯৯)
- ক্রান্তি (২০০৩)
- রি ইভোল্যুশন (২০০৪)
- ভ্যারিয়েশন নং. ২৫ (২০০৬)
- ভ্যারিয়েশন নং. ২৫.২ (২০০৬)
- বন্য (২০০৭)
পর্দার ওপারের জীবন
ফুয়াদের পরিবার স্থায়ীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত ব্যবসার সাথে জড়িত। তবে গানের পাশাপাশি ফুয়াদের ব্যক্তিগত জীবনটাও বেশ ছিমছাম আর সুন্দর। ২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘মায়া’-র সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী মায়া কানাডার বিখ্যাত ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্ম (Social Work) বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এই দম্পতির কোল আলো করে আসে তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তান, আজালিয়া।

আজকের দিনে আমরা যে লফি (Lo-Fi), সিন্থ-পপ কিংবা ফিউশন মিউজিকের জোয়ার দেখি, ফুয়াদ আল মুকতাদির তার বীজ বুনেছিলেন আরও বহু বছর আগে। প্রবাসে থেকেও বাংলার লোকজ সুরকে ওয়েস্টার্ন সাউন্ডের সাথে যেভাবে তিনি গুলিয়ে দিয়েছিলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। সময়ের সাথে সাথে অনেক ট্রেন্ড বদলে যায়, কিন্তু বাংলা কমার্শিয়াল মিউজিকে আধুনিকতার ছোঁয়া দিতে ফুয়াদের নাম সবসময় প্রথম সারিতেই থাকবে।
