
‘ফকির লালন সাঁইয়ের নির্বাচিত একশত সঙ্গীত’ বইটি আবুল কাশেম মুরাদ এর লিখা। লক্ষ-কোটি লালন অনুরাগী তথা বাংলা ভাষাভাষী সকলের কাছে সুলভে লালন সংগীতকে পৌঁছে দেবার লক্ষ্যেই এই লালনসংগীত সংকলন গ্রন্থটি সদর প্রকাশনীর পক্ষ থেকে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সংকলন গ্রন্থটিতে তেমন কোনো নতুনত্ব বা বিশেষত্ব নেই। কারণ প্রচলিত ধারায় যেভাবে লালনসংগীত চর্চা বিদ্যমান, প্রধানত সে ধারাটিকেই এখানে অনুসরণ করা হয়েছে।
কিন্তু একথা বোদ্ধা মাত্রই স্বীকার করবেন যে, লালন দর্শন প্রসঙ্গে যেমন ঠিক তেমনই লালনসংগীতের প্রচলিত লিপিবদ্ধ ধারাটি প্রসঙ্গে নিবিড় গবেষণার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১, মাইকেল (১৮২৪-১৮৭৩) এবং বঙ্কিম (১৮৩৮-১৮৯৪) কর্তৃক বাংলাভাষায় যে আধুনিক রূপটির উন্মেষ ঘটেছিল, পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১- ১৯৪১) ও তাঁর অনুসারীগণ এবং রবীন্দ্র বলয়ের বিরুদ্ধচারীগণ, যেমন: তিরিশ (১৯৩০) দশকের কথিত আধুনিক বাংলা কবিগণের ধারাবাহিকতায় আজকে একুশ শতকে বাংলাভাষার যে মানদণ্ডটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে-তা লালন (১৭৭৪-১৮৯০) অনুসারী শ্রুতিনির্ভর কণ্ঠধারক বাউলগণ বা লিপিকারকগণ কর্তৃক সম্যকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভবপর ছিল না।
কিন্তু লালন তাঁর সম্যক দিব্যদৃষ্টির কারণে কালোত্তর বাংলাভাষায় বিনির্মাণটি অবশ্য-অবশ্যই উপলব্ধি করতেন। অন্যদিকে স্বয়ং লালন কর্তৃক অনুমোদিত কোনো লিপিবদ্ধ সংগ্রহ নেই। আর আমরা জানি যে মানব স্মৃতিফলক সম্যক জ্ঞানীগণ ব্যতীত সহজেই বিস্মৃতিতে জড়িয়ে পড়ে। লোকগীতির ধারায় অঞ্চল বিশেষের মধ্যে বিদ্যমান গড়মিল থেকে যা সহজেই বোঝা যায়। অতএব প্রচলিত লালন সংগ্রহসমূহ কোনোক্রমেই ভাষাগত ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়। এবং দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, প্রকাশিত গ্রন্থাবলির সম্পাদকগণের জ্ঞানের সীমা অনেক সময় ঐ ভ্রান্তির পরিধিকে আরও বর্ধিত করেছে।