সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৫৮ এএম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদর ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য প্রতিভা। মৃত্যুর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ আজও বাঙালির চেতনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠেন তিনি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতার ভিতকে আরও শক্তিশালী করে।
বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে নজরুলের অবদান বহুমাত্রিক। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গজল, হামদ, নাত ও শ্যামাসংগীত—বিভিন্ন ধারায় তিনি অসামান্য সৃষ্টি রেখে গেছেন। তাঁর লেখায় যেমন বিদ্রোহের ভাষা উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি প্রেম, সাম্য, মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির কথাও শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে।
নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবনের সক্রিয় সময়কাল ছিল প্রায় ২৩ বছর। এই তুলনামূলক স্বল্প সময়েই তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমন এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের লেখক ও শিল্পীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জাগিয়েছে।
নজরুল নিজেই তাঁর জীবন ও সৃষ্টির দ্বৈত সত্তাকে তুলে ধরেছিলেন—এক হাতে বাঁশরী, অন্য হাতে রণতূর্য। তাঁর সাহিত্যেও সেই বৈপরীত্য স্পষ্ট। প্রেম ও বিদ্রোহ, কোমলতা ও প্রতিবাদ, আধ্যাত্মিকতা ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা পাশাপাশি অবস্থান করেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবিকে সপরিবার বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে তাঁর জন্য একটি বাড়িও দেওয়া হয়েছিল।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাজী নজরুল ইসলামকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
সাহিত্য ও সংগীতে নজরুলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ছিল মানুষের কথা বলা। তাঁর রচনায় সাম্য ও মানবিক মর্যাদার যে দাবি উঠে এসেছে, তা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ কারণেই সময় বদলালেও তাঁর অনেক কবিতা, গান ও বক্তব্য নতুন প্রেক্ষাপটে পাঠকের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১২ ভাদর সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শোভাযাত্রা করে কবির সমাধিতে যাবেন। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠের পর সমাধি প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সমাধিস্থ করা হয় জাতীয় কবিকে। পাঁচ দশক পরও সেই সমাধি বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার গুরুত্বপূর্ণ এক স্মারক হয়ে আছে। নজরুলের প্রয়াণ ঘটেছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে কণ্ঠ তিনি রেখে গেছেন, তা এখনো বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চেতনায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মন্তব্য