কিছু গান কানে শোনার পর হৃদয়ের এমন এক গোপন কোণ স্পর্শ করে, যেখানে জমে থাকা স্মৃতির কপাট আপনাআপনি খুলে যায়। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান ঠিক তেমনই এক জাদুকরী অনুভূতির নাম, যার প্রতিটি ছত্রে প্রেম, বিরহ আর জীবনের নানা রঙ এমনভাবে মিশে থাকে যে প্রজন্ম পেরিয়েও তা শ্রোতার মনে চিরসবুজ হয়ে থাকে। ১৯৬৬ সালের ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকর ও মান্না দের কণ্ঠে গাওয়া “কে প্রথম কাছে এসেছি” গানটির কথা শুনলেই মনে হয় ভালোবাসার প্রথম সোনালী বিকেলটি যেন আজও ফুরিয়ে যায়নি।
১৯৩১ সালের ২ মে হাওড়ার সালকিয়ায় জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটির শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল শিল্প-সাহিত্যঘেরা এক পারিবারিক পরিবেশে। পরবর্তীতে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তাঁর মন পড়েছিল সুর আর শব্দের ভুবনে। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তিনি একের পর এক অসাধারণ গান উপহার দিয়ে বাংলা সংগীতের ভিত্তি শক্ত করে দেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, গীতা দত্ত, আশা ভোঁসলে, হৈমন্তী শুক্লাসহ সেকালের প্রায় সব প্রথিতযশা শিল্পী তাঁর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
চার হাজারের বেশি গানের বিশাল সম্ভার ছাড়াও তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, ছড়া এবং চিত্রনাট্য রচনায় মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। ‘কথায় কথায় রাত হয়ে যায়’ তাঁর একটি অনন্য আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, যা পাঠক মহলে দারুণ সমাদৃত হয়। তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে চরম মানসিক অবসাদ এবং একাকীত্ব তাঁকে গ্রাস করেছিল। ১৯৯৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হুগলি নদীতে লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে বাংলা গানের এই মহান শিল্পী চিরবিদায় নেন, যা গোটা সংগীতজগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ আজও ভক্তদের মনে এক অজানা প্রশ্নের জন্ম দেয়, কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টিগুলো বাংলা ভাষার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তাঁকে চিরকালের জন্য বাঁচিয়ে রেখেছে।















