হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দরবারে দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীতের অনেক রাগের আগমন ঘটেছে, যা উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছে। তেমনই সুদূর দক্ষিণ থেকে আসা এক অনন্য, মিষ্টি এবং গম্ভীর রাগের নাম ‘রাগ মধুকোষ’। উত্তর ভারতের সঙ্গীত আসরগুলোতে এই রাগের পরিবেশন খুব একটা বেশি দেখা যায় না, যার ফলে এটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে এক দুর্লভ ও বিশেষ আকর্ষণ।
Table of Contents
রাগ মধুকোষ: দক্ষিণ ভারতের হেমবতী ঠাট থেকে আসা এক মিষ্টি সুরের ধারা
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জগতে রাগ মধুকোষ তার বিশেষ স্বর বিন্যাসের জন্য অত্যন্ত অনন্য। এই রাগটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সঙ্গীত পদ্ধতির হেমবতী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। উত্তর ভারতের সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে এই রাগটি উপস্থাপনের চল খুব একটা বেশি দেখা যায় না, যার কারণে রাগটি সাধারণ শ্রোতাদের কাছে কিছুটা অপ্রচলিত ও দুর্লভ।
স্বরের মিতব্যয়িতা ও চলন
এই রাগের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর স্বর প্রয়োগের সরলতা। রাগ মধুকোষে তীব্র মধ্যম (হ্ম), কোমল গান্ধার (জ্ঞ) এবং কোমল নিষাদ (ণ)-এর এক অপূর্ব চলন লক্ষ্য করা যায়। এটি একটি ঔড়ব জাতির রাগ হওয়ায় এর সুরের বিস্তার অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং মিষ্টি।
রাগ মধুকোষ-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এই রাগের মূল পরিচিতি ও কাঠামো নিচে তুলে ধরা হলো:
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির হেমবতী ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-ঔড়ব। এর আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে (৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো পঞ্চম (প)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ষড়্জ (সা)।
- অঙ্গ (Anga): এটি একটি উত্তরাঙ্গ প্রধান রাগ।
- পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মধুকোষ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো মধ্যরাত্রি। গভীর রাতের নিস্তব্ধতার বুকে এই রাগের স্বরলিপি এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগের সেই বিশেষ চলন এবং স্বরের গতিপ্রকৃতি স্বরলিপির মাধ্যমে বোঝার জন্য এর নিখুঁত রূপ নিচে দেওয়া হলো:
- আরোহণ: স জ্ঞ হ্ম ণ র্স
- অবরোহণ: র্স ণ প হ্ম জ্ঞ, স
- পকড় (রাগের মূল রূপ): প, হ্ম, প ণ প, হ্ম জ্ঞ স
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী ‘জ্ঞ’ দিয়ে কোমল গান্ধার, ‘হ্ম’ দিয়ে তীব্র মধ্যম এবং ‘ণ’ দিয়ে কোমল নিষাদকে নির্দেশ করা হয়েছে। কোনো ইংরেজি অক্ষর বা টাইপো ছাড়া স্বরলিপিটি সম্পূর্ণ নির্ভুল রাখা হয়েছে।)
তথ্যসূত্র
এই রাগের তাত্ত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ চিন্ময় লাহিড়ী রচিত এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘মগনগীত ও তান মঞ্জরী’ (চতুর্থ খণ্ড) গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
রাগ মধুকোষ তার দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যের কারণে আমাদের চেনা রাগগুলোর চেয়ে কিছুটা আলাদা আমেজ তৈরি করে। মধ্যরাতের শান্ত ও নিঝুম পরিবেশে এই রাগের তীব্র মধ্যম আর কোমল গান্ধারের মেলবন্ধন শ্রোতার মনকে এক অলৌকিক ও গভীর প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।
হেমবতী ঠাটের এই দুর্লভ রাগটি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।













