রাগ মোহনকোষ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল জগতে কিছু রাগ রয়েছে যা তাদের অনন্য স্বরবিন্যাস এবং চলনের কারণে প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা পড়ে না। তেমনই এক ব্যতিক্রমী ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত রাগের নাম ‘রাগ মোহনকোষ’। সাধারণত রাগগুলোকে কোনো না কোনো ঠাটের অধীনে শ্রেণীবদ্ধ করা হলেও, এই রাগটি তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট ঠাটের আওতাভুক্ত নয়।

রাগ মোহনকোষ: শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক ব্যতিক্রমী ও অনিন্দ্য সুর

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি রাগেরই একটি নির্দিষ্ট ‘ঠাট’ বা জনক-স্কেল থাকে। কিন্তু ‘রাগ মোহনকোষ’ এই নিয়মের এক চমৎকার ব্যতিক্রম। এর স্বর গঠন এতটাই স্বতন্ত্র যে, উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে একে কোনো নির্দিষ্ট ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। আর এই অনির্দেশিত বা স্বাধীন বৈশিষ্ট্যের কারণেই রাগটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বোদ্ধাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও কৌতূহল উদ্দীপক এক সৃষ্টি।

রাগ মোহনকোষ-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়মানুযায়ী রাগ মোহনকোষের মূল কাঠামো ও প্রযুক্তিগত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঠাট (Thaat): এই রাগের কোনো নির্দিষ্ট ঠাট নেই (অনির্দেশিত)।
  • জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ষাড়ব-ঔড়ব। অর্থাৎ, এর আরোহণে পঞ্চম (পা) বর্জিত থাকায় ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, অবরোহণে পঞ্চম (পা) এবং ঋষভ (রে)—উভয় স্বর বর্জিত থাকায় ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়।
  • বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো মধ্যম (মা)
  • সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো Context/ষড়্‌জ (সা)
  • অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
  • পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মোহনকোষ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো দিবাভাগ। দিনের আলোয় এই রাগের স্বরগুলোর সৌন্দর্য সবচেয়ে দারুণভাবে ফুটে ওঠে।

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

রাগটির সুরের গতিপ্রকৃতি ও চলন বোঝার জন্য এর প্রধান স্বরলিপি নিচে দেওয়া হলো:

আরোহণ: স র গ ম দ ণ র্স

অবরোহণ: র্স ণ দ ম গ স

পকড় (রাগের মূল রূপ): স, দ্ণ্‌স, হ্মগস, র, গম, ণদম, গস

তথ্যসূত্র

এই রাগের তাত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ‘নাথ ব্রাদার্স’ কর্তৃক ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

রাগ মোহনকোষ
রাগ মোহনকোষ

রাগ মোহনকোষ আমাদের শেখায় যে, সঙ্গীতের সৌন্দর্য সবসময় বাঁধা-ধরা নিয়মের ফ্রেমে আটকে থাকে না; নিয়মের বাইরে গিয়েও এক অদ্ভুত মায়াবী সুর সৃষ্টি করা সম্ভব। দিনের শান্ত পরিবেশে রাগ মোহনকোষের বিস্তার শ্রোতার মনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়।

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এই রাগটি নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন আপনার কেমন লাগল, তা কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

Leave a Comment