রাগ শুদ্ধ বিলাবল । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

উষালগ্নের স্নিগ্ধতা আর ভোরের প্রথম আলোর মতো যদি কোনো রাগের চরিত্র হয়ে থাকে, তবে তা হলো ‘রাগ শুদ্ধ বিলাবল’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি কেবল একটি রাগই নয়, বরং এটি হলো ‘বিলাবল ঠাট’-এর জনক বা আশ্রয়দাতা রাগ। একে স্থানভেদে রাগ বিলাওল, বেলাওল বা বেলাবলী নামেও ডাকা হয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সঙ্গীতরত্নাকর’-এর মতে, প্রাচীন ‘ককুভ’ নামক গ্রাম রাগের ভাষা রাগ ছিল ‘ভোগবর্ধনী’। আর এই ভোগবর্ধনী থেকেই আজকের শুদ্ধ বিলাবলের উৎপত্তি। স্বরগত দিক থেকে দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সঙ্গীতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘শঙ্কারাভরণ’ রাগের সাথে এর এক অদ্ভুত ও চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

রাগ শুদ্ধ বিলাবল । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

শুদ্ধ বিলাবলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি স্বর ‘শুদ্ধ’। আমাদের চেনা ওয়েস্টার্ন মিউজিকের ‘মেজর স্কেল’ (Major Scale) বা বাংলার ‘সারেগামাপাধানি’-র একদম আদি ও অকৃত্রিম রূপ লুকিয়ে আছে এই রাগে।

উত্তর ভারতে এই বিলাবল ঠাটের ওপর ভিত্তি করে নানা ধরনের রাগ প্রচলিত থাকলেও, তার মূল কাঠামোটি কিন্তু এই শুদ্ধ বিলাবল থেকেই আসে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদম স্বতন্ত্র বা একক রাগ হিসেবে শুদ্ধ বিলাবলের পরিবেশন এখন আর মঞ্চে তেমন একটা দেখাই যায় না। বহু সঙ্গীতজ্ঞ মনে করেন, শুদ্ধ বিলাবল মূলত একটি শক্তিশালী ‘অঙ্গ’ বা সুরের ভিত্তি। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ওস্তাদরা বিভিন্ন সময়ে তৈরি করেছেন—আলাহিয়া বিলাবল, নট বিলাবল, শুক্ল বিলাবল, বঙ্গাল বিলাবল কিংবা হেম বিলাবলের মতো শ্রোতাপ্রিয় সব রাগ।

ঐতিহাসিক ‘সেনী ঘরানা’-তে আবার এই রাগের দুটি ভিন্ন রূপের চলন দেখা যায়:

১. এক প্রকারে রেখাব (র) এবং পঞ্চম (প) বর্জিত করে তৈরি করা হয় ‘ঔড়ব বিলাবল’।

২. আবার অন্য প্রকারে সামান্য ‘কড়ি মধ্যম’ (হাঁ)-এর ব্যবহার দেখা যায়। আর এই কড়ি মধ্যমের সূক্ষ্ম ছোঁয়ার কারণেই অনেকে শুদ্ধ বিলাবলকে ভালোবেসে ‘সকালের কল্যাণ’ (কল্যাণ রাগের মতো মেজাজ থাকায়) বলে ডাকেন।

এর আরোহণে ‘বক্র নিষাদ’ (ন)-এর ব্যবহারের ফলে সুরের চলনটি হয় ‘ধ ন ধ র্স’। আবার অবরোহণে ‘গ ম র স’ স্বর-সমন্বয়ের মাধ্যমে এক চমৎকার বক্রস্বরের মায়াজাল তৈরি হয়।

রাগের কারিগরি ও ব্যাকরণ:

  • আরোহণ: স র গ ম প ধ ন র্স
  • অবরোহণ: র্স ন ধ প ম গ র স
  • ঠাট: বিলাবল
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (সাতটি স্বরই উপস্থিত)
  • বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): ‘ধ’ (ধৈবত)
  • সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): ‘গ’ (গান্ধার)
  • ন্যাস স্বর: মন্দ্র সপ্তকের পঞ্চম (প)
  • স্বরবিন্যাস: পন ধন র্স
  • অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ প্রধান।
  • পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): স র গ ম, গ, প, ম গ, ম গ র গ ম র স।

 

সময়ের মায়াজাল ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:

রাগ শুদ্ধ বিলাবলের মূল বিস্তার ঘটে সাধারণত মন্দ্র (নিচু) এবং মধ্য সপ্তকে। এর প্রকৃতি অত্যন্ত শান্ত, গভীর এবং ধ্যানমগ্ন।

এই রাগের পরিবেশনের উপযুক্ত সময় হলো দিবা প্রথম প্রহর (ভোর থেকে সকাল)। তবে কোনো কোনো ওস্তাদ একে দিবা দ্বিতীয় প্রহরেও গেয়ে থাকেন। নিশি অবসানে যখন পৃথিবীর বুকে ভোরের প্রথম সূর্য উঁকি দেয়, চারপাশের প্রকৃতি যখন ঘুম ভেঙে শান্ত চোখে তাকায়—ঠিক তখনই তানপুরার ঝংকারে জেগে ওঠে শুদ্ধ বিলাবল। এর শান্ত প্রকৃতি এবং ‘ধ’ ও ‘গ’ স্বরের নিখুঁত মেলবন্ধন শ্রোতার মনে এক পরম আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, নতুন দিনের আশা এবং এক পবিত্র ব্যাকুলতার জন্ম দেয়। মাঝরাতের একাকীত্ব শেষে এই রাগ যেন মানুষের মনকে এক পশলা ভোরের হাওয়ার মতো জুড়িয়ে দেয়।

রাগ শুদ্ধ বিলাবল
রাগ শুদ্ধ বিলাবল

তথ্যসূত্র ও আকর গ্রন্থ:

আপনার এই গবেষণাধর্মী লেখাটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তৎকালীন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের এই আকর গ্রন্থগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে:

১. মগনগীত ও তান মঞ্জরী (প্রথম খণ্ড) — চিন্ময় লাহিড়ী। প্রকাশিকা: শ্রীমতী ইলা লাহিড়ী (১৪ এপ্রিল, ১৯৮৫, পৃষ্ঠা: ৩১)।

২. রাগ রূপায়ণ (প্রথম খণ্ড) — সুরেশ চক্রবর্তী। জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমেটেড (সেপ্টেম্বর ১৯৬৫, পৃষ্ঠা: ১০০)।

৩. রাগশ্রেণী — ভীমরাও শাস্ত্রী। শান্তিনিকেতন প্রেস (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা: ৪৮)।

৪. হিন্দুস্থানী সঙ্গীত পদ্ধতি (প্রথম খণ্ড) — মূল রচয়িতা: পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে। অনুবাদ: অসীমকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিকা সাহা। দীপায়ন (মাঘ ১৩৯৮, পৃষ্ঠা: ৩০)।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।