‘আর কি এমন মানবজনম বসব সাধুর মেলে, হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায় ঘিরে নিল কালে’—লালনের এমন মরমি গানের বাণী আর একতারা-দোতারার সুরে মুখর ছিল আখড়াবাড়ির পরিবেশ। সাধন-ভজন, গুরুসেবা ও গানের আসরে দুই দিন ধরে একত্র হন সাধু-ফকির, বাউল এবং লালনভক্তরা। তাঁদের কাছে এই আয়োজন শুধু বার্ষিক উৎসব নয়; আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং লালনের মানবতাবাদী দর্শন চর্চারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
লালন একাডেমির উদ্যোগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব শুরু হয় গত শনিবার। ওই দিন অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো সাধু-ফকির, বাউল, ভক্ত-অনুরাগী ও দর্শনার্থী এতে অংশ নেন। তাঁদের পদচারণে আখড়াবাড়ি ও কালী নদীর তীরজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
শনিবার বিকেলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লালনের জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
রোববার সন্ধ্যায় স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ অন্যরাও সভায় অংশ নেন। আলোচনা শেষে রাতে বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মরমি গানের আসর।
সাধুসঙ্গে লালনের দর্শনচর্চা
পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বৈঠকি আসরে লালনের গান পরিবেশিত হতে থাকে। একতারা ও দোতারার সুরে সাধু-ফকিররা গানের বাণী তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করেন। তাঁদের আলোচনা ও সাধনার কেন্দ্রে ছিল লালনের মানবতা, সাম্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন।
কেউ গানে, কেউ আলোচনায়, আবার কেউ গুরুসেবা ও সাধন-ভজনের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। এই আয়োজনের মাধ্যমে সাধু-ফকিরদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ তৈরি হয় এবং লালনের দর্শন ও গানের ঐতিহ্য চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
সাধু আব্দুর রাজ্জাক সাঁই বলেন, দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। এরপর সাধু-ফকিররা সাঁইজির ধাম ছাড়তে শুরু করেছেন। দোল উৎসবে আবারও সবাই একত্র হবেন।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি শিক্ষাকেন্দ্র। আমরা এখানে শিখতে আসি। বছরের দুটি আয়োজন আমাদের সাধু-ফকিরদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।’
সাধু মনসুর সাঁই বলেন, এখানে লালন সাঁইয়ের বাণী গানের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। পাশাপাশি সাধু-ফকিরদের মধ্যে আলোচনা ও ভাবের আদান-প্রদান চলে। সব মিলিয়ে সাধুসঙ্গ লালনের দর্শন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।
কালী নদীর তীরে জমজমাট মেলা
সাধুসঙ্গের পাশাপাশি আখড়াবাড়িসংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা। বিভিন্ন পণ্য নিয়ে দোকান সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। উৎসব দেখতে আসা মানুষের অনেকে মেলায় কেনাকাটা করছেন, আবার কেউ ঘুরে দেখছেন বিভিন্ন পণ্যের দোকান।
সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চলবে। ফলে সাধু-ফকিরদের অনেকে ফিরে যেতে শুরু করলেও দর্শনার্থীদের জন্য উৎসবের পরিবেশ উপভোগের সুযোগ থাকছে।
নিরাপত্তায় ৮৭২ পুলিশ সদস্য
উৎসবে আগত সাধু-ফকির, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন রয়েছেন ৮৭২ জন পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে আনসার ও এসআরবির বিশেষ দল।
প্রতি বছর লালন স্মরণোৎসব ও সাধুসঙ্গকে ঘিরে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের সমাগম ঘটে। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে লালনের গান, সাধনা ও মানবতাবাদী চিন্তার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লালনের মানবতাবাদী দর্শন
প্রায় দেড় শতাব্দী আগে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। তাঁর মৃত্যুর পরও গুরু-পরম্পরায় সাধু-ফকির ও অনুসারীরা তাঁর দর্শন, গান এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আসছেন।
লালনের গানে মানুষের পরিচয়, সাম্য, সামাজিক বিভেদ এবং আত্মিক অনুসন্ধানের মতো বিষয় উঠে এসেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে মূল্যায়ন করার আহ্বান তাঁর দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর গান ও চিন্তা বাংলাদেশের লোকসংগীত এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেই এবারও অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়েছে মরমি এই সাধককে। সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও আলোচনা, গান ও গ্রামীণ মেলাকে ঘিরে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত আখড়াবাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকবে। এরপর দোল পূর্ণিমার উৎসবে আবারও সাধু-ফকির, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা সাঁইজির ধামে সমবেত হবেন।















