বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে তাঁর কালজয়ী গান, সাম্যবাদী চিন্তা ও মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গানে গানে সাধক লালনের জীবনবোধ তুলে ধরেছেন দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের লোকসংগীতশিল্পীরা। তবে সংগীত ও আলোচনায় সমৃদ্ধ এই আয়োজনের পুরোটা সময়জুড়েই অনুভূত হয়েছে ‘লালনকন্যা’ হিসেবে পরিচিত প্রয়াত সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের অনুপস্থিতি। লালনের গানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণ করেছেন সংগীতপ্রেমীরা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে এ স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আলোচনা পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। পরে একে একে মঞ্চে ওঠেন লোকসংগীতশিল্পীরা। তাঁদের কণ্ঠে লালনের গান পরিবেশিত হলে মিলনায়তনে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। গানের কথায় উঠে আসে মানবপ্রেম, আত্মঅনুসন্ধান, আধ্যাত্মিকতা ও মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করার আহ্বান।
Table of Contents
সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বার্তা
আলোচনা পর্বে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম সাম্য, বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তব্যে তিনি সাতক্ষীরায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে লালনের মানবতাবাদী দর্শন ধারণ করার আহ্বান জানান।
লালনের গান ও দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের পরিচয়কে ধর্ম, জাতপাত কিংবা সামাজিক অবস্থানের সীমায় আটকে না রাখা। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক মর্যাদার চর্চা তাঁর সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ দিক। অনুষ্ঠানের আলোচনায়ও সেই দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা উঠে আসে। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে কাউকে হেয় করা বা তাঁর অধিকার অস্বীকার করার প্রবণতা রোধে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কতটা জরুরি, তা বক্তাদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হারুন-অর-রশীদের সভাপতিত্বে আলোচনা পর্বে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম, মুখ্য আলোচক শিল্পী ও গবেষক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমী, বিএনপির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল এবং জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন।
বক্তারা লালনের গান ও জীবনদর্শনের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। বাংলা লোকসংগীতের এই সমৃদ্ধ ধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর মানবিক চিন্তাধারাকে সমকালীন সমাজে চর্চার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
লালনের গানে মুখর জাতীয় নাট্যশালা
আলোচনা শেষে শুরু হয় সংগীত পরিবেশনা। লোকসংগীতশিল্পী লতিফ শাহ ‘দৈন্য গান’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সংগীতপর্বের সূচনা করেন। লালনের গানের সঙ্গে তাঁর পরিচিতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, গৌতম ঘোষ পরিচালিত ২০১০ সালের চলচ্চিত্র ‘মনের মানুষ’-এও তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছিল। চলচ্চিত্রটিতে লালন সাঁইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন ভারতীয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
এরপর মঞ্চে আসেন নাসরিন সুলতানা বিউটি। তিনি পরিবেশন করেন ‘কৃষ্ণ প্রেমে পড়া দেহ’। আলেয়া বেগম লালনের আরও কয়েকটি গান গেয়ে শোনান। বিমান চন্দ্র বিশ্বাসের কণ্ঠে ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’ এবং মৌসুমী ইকবালের পরিবেশনায় ‘হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায়’ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
প্রবীণ লোকসংগীতশিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া পরিবেশন করেন ‘দেখা দিয়েও হে রাসুল’। তাঁর পরিবেশনার পর কানিজ খন্দকার মিতু গেয়ে শোনান ‘ঘরে কে বা জাগে কে বা ঘুমায়’। এ ছাড়া সংগীতপর্বে অংশ নেন সুমন রায়, পাখি বাউলিয়ানা ও সুলতানা জামান জোছনা। প্রত্যেক শিল্পীর পরিবেশনায় লালনের সৃষ্টির ভিন্ন ভিন্ন আবেদন ফুটে ওঠে। কোথাও আত্মজিজ্ঞাসা, কোথাও আধ্যাত্মিক অনুভব, আবার কোথাও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গভীরতা হয়ে ওঠে গানের মূল সুর।
লালনের গান কেবল সুর ও কথার সমন্বয়ে তৈরি সংগীত নয়; এর মধ্যে রয়েছে জীবন, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের অর্থ খোঁজার নিরন্তর প্রচেষ্টা। সহজ ভাষায় গভীর প্রশ্ন তোলার ক্ষমতাই তাঁর গানকে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাসঙ্গিক রেখেছে। স্মরণানুষ্ঠানের পরিবেশনাগুলোতেও সেই বহুমাত্রিকতা ধরা পড়ে।
ফরিদা পারভীনের শূন্যতা ছিল স্পষ্ট
এবারের স্মরণানুষ্ঠানে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে প্রয়াত সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের অনুপস্থিতি। ‘লালনকন্যা’ ও ‘লালনসম্রাজ্ঞী’ হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে লালনের গানকে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও পরিবেশনাশৈলীতে শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেছেন। তাঁর গায়কিতে লালনের দর্শন যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি সংগীতের আবেগ ও বাণীর গভীরতাও পেয়েছে বিশেষ মাত্রা।
বাংলার বাউলসংগীতের ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে সাধক, গায়ক ও শিষ্যদের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। এই ধারাকে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রচলিত লোকসংগীতের পরিসর ছাড়িয়ে লালনের গানকে সাধারণ শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে তাঁর পরিবেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাঁর কণ্ঠে লালনের গান শুনে বহু শ্রোতা এই সাধকের দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। ফলে লালনের স্মরণানুষ্ঠানে ফরিদা পারভীনের অনুপস্থিতি কেবল একজন শিল্পীর অভাব হিসেবে নয়, বরং বাংলা লোকসংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মৃতি হিসেবেও অনুভূত হয়েছে। লালনের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অন্য শিল্পীরা যখন তাঁর সৃষ্টিকে নতুন করে তুলে ধরছিলেন, তখন ফরিদা পারভীনের অবদানও অনিবার্যভাবে মনে পড়েছে।
সমাপনী পরিবেশনায় ফিরে এল লালনের চিরন্তন দর্শন
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কণ্ঠশিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’, ‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে’ এবং ‘মিলন হবে কত দিনে’। গানগুলোর মধ্য দিয়ে লালনের সৃষ্টিতে থাকা আত্মঅনুসন্ধান, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্ক্ষা আবারও সামনে আসে।
লালনের গানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তর্গত সত্তা ও মানবিক গুণাবলিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিতে দেহ ও মনের সম্পর্ক, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, গুরু-শিষ্যের বন্ধন এবং পরম সত্তাকে উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা নানা রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এসব ভাবনা ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে মানুষকে নিজের অস্তিত্ব এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে ভাবতে শেখায়।
বাংলার বাউল ঐতিহ্যে লালন সাঁইয়ের অবস্থান তাই কেবল একজন গীতিকার কিংবা সংগীতসাধকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গান লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হওয়ার পাশাপাশি মানবতাবাদী চিন্তারও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁর সৃষ্টির আবেদন টিকে থাকার পেছনে রয়েছে এই দর্শনের সর্বজনীনতা।
রাজধানীর স্মরণানুষ্ঠানটি তাই শুধু একজন সাধক ও সংগীতস্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন ছিল না। সেখানে উঠে এসেছে বর্তমান সমাজে সহনশীলতা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাও। শিল্পীদের কণ্ঠে লালনের গান সেই বার্তাকে নতুন করে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
ফরিদা পারভীনের অনুপস্থিতি যেমন তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, তেমনি লালনের গানও আবার প্রমাণ করেছে—সময়ের পরিবর্তন হলেও মানবিকতা, সাম্য ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রশ্নগুলো কখনো পুরোনো হয়ে যায় না। লালনের সুরে তাই আজও মানুষ খুঁজে ফেরে নিজের পরিচয়, অন্যের প্রতি ভালোবাসা এবং বিভেদহীন এক মানবিক সমাজের স্বপ্ন।














