চারণকবি ও বাউলসাধক বিজয় সরকারের এক অনবদ্য ও অমর লোকসৃষ্টি “সাজুর ব্যথায় আজও কাঁদে”। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কালজয়ী আখ্যানকাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর ট্র্যাজিক প্রণয়কাহিনী—রূপাই ও সাজুর আত্মিক প্রেম, বিচ্ছেদ এবং মৃত্যুর পটভূমিতে গানটি রচিত। গ্রামীণ জীবনের গভীর আবেগ, বৈশাখী ঝড়ের মতো আকস্মিক নিয়তির আঘাত এবং মৃত্যুর পরও দুটি হৃদয়ের চিরন্তন ভালোবাসাকে কবি অত্যন্ত দরদি ভাষায় এই গানে রূপায়িত করেছেন।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | সাজুর ব্যথায় আজও কাঁদে |
| গীতিকার ও সুরকার | চারণকবি বিজয় সরকার |
| সংগীতধারা | লোকসংগীত / বাউল, জারি ও কবিগানের সংমিশ্রণ |
| মূল পটভূমি | পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের আখ্যানকাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ |
| মূল চরিত্র | রূপাই ও সাজু |
| মূল উপজীব্য | চিরন্তন প্রেম, বিচ্ছেদের হাহাকার, নিয়তির নির্মমতা ও অমর বিরহ |
| আঞ্চলিক প্রভাব | বৃহত্তর যশোর-নড়াইল ও ফরিদপুর অঞ্চলের লোকসুর |
সাজুর ব্যাথায় আজও কাঁদে [ Sajur bathai aj o kade ]
নকসি কাঁথার মাঠেরে সাজুর ব্যথায় আজো কাঁদে
রূপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশি ।
তাঁদের আশার বাসা ভেঙে গেছে
রে তবু যায় নি ভালোবাসাবাসি ।।
কতো আশা বুকে নিয়ে বেঁধেছিলো ঘর
কতো সুখে মিশেছিলো মিলনমঞ্চপর
হঠাৎ আসিয়া এক বৈশাখী ঝড় রে
সে ঘর কোথা গেলো ভাসি ।।
সাজুর কবরের এক পাশে নকসি কাঁথা গায়
রূপাই মিয়া শুয়ে আছে মরণের শয্যায় ;
তারা আছে চির নীরবতায় রে
তাদের দুইটি হিয়া পাশাপাশি ।।
অকরুণ দারুণ বিধি বিচার তোর কেমন
তোর বুঝি ভালোবাসার কেউ নাহি রে এমন ;
তাই তে বুঝিস না তুই বিরহীর মন রে
হারে কেমন তাদের কান্নাহাসি ।।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বেদনার ছায়ায়
নকসিকাঁথা লিখেছে তার মনেরি মায়ায় ;
ভাবুক কবিগণ আনে কল্পনায় রে
যতো সত্য লোকের তত্ত্বরাশি ।।
নকসি কাথাঁর মাঠে লোকে আজো শুনতে পায়
সাজুর ব্যথার রূপাইমিয়া বাঁশরি বাজায় ;
পাগল বিজয় বলে , পরানে চায় রে
আমি একবার গিয়ে শুনে আসি ।।
Sajur Bathay Ajo Kande [Sajur Bathay Ajo Kande]
Nokshi Kanthar Mathere Sajur bathay ajo kande
Rupai Miyer basher bashi.
Tander ashar basa bhenge gechhe
Re tabu jay ni bhalobashabashi.।
Koto asha buke niye bendhechhilo ghor
Koto sukhe mishechhilo milonmonchopor
Hothat ashiya ek Boishakhi jhor re
Se ghor kotha gelo bhasi.।
Sajur koborer ek pashe nokshi kantha gay
Rupai Miya shuye achhe moroner shojyay;
Tara achhe chir nirobotay re
Tader duiti hiya pasapashi.।
Okarun darun bidhi bichar tor kemon
Tor bujhi bhalobashar keu nahi re emon;
Tai te bujhis na tui birohir mon re
Hare kemon tader kannahashi.।
Pollikobi Jasimuddin bedonar chhayay
Nokshikantha likhechhe tar moneri mayay;
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. বাঁশের বাঁশির অবিনশ্বর হাহাকার
- “নকসি কাঁথার মাঠেরে সাজুর ব্যথায় আজো কাঁদে রূপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশি…”গানটির শুরুতেই পল্লীবাংলার এক চিরন্তন লোকজ অনুষঙ্গ ‘বাঁশের বাঁশি’-র উল্লেখ করা হয়েছে। রূপাইয়ের বাজানো বাঁশির সুরটি আর নিছক সুর নয়, তা পরিণত হয়েছে সাজুর অসমাপ্ত জীবনের দীর্ঘশ্বাসে।
২. আশার বাসা ও বৈশাখী ঝড়ের আঘাত
- “কতো আশা বুকে নিয়ে বেঁধেছিলো ঘর… হঠাৎ আসিয়া এক বৈশাখী ঝড় রে সে ঘর কোথা গেলো ভাসি…”এখানে ‘বৈশাখী ঝড়’ সামাজিক সংকট ও নিয়তির নিষ্ঠুর আঘাতের রূপক। এক টুকরো সুখের নীড় বাঁধার স্বপ্ন কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়, গ্রামীণ চিত্রকল্পে তা মূর্ত হয়েছে।
৩. চিরনীরবতার শয্যায় মিলন
- “সাজুর কবরের এক পাশে নকসি কাঁথা গায় / রূপাই মিয়া শুয়ে আছে মরণের শয্যায়…”জীবদ্দশায় যাদের মিলন সম্ভব হয়নি, মৃত্যুর ওপারে তারা একাকার হয়ে গেছে। পাশাপাশি দুটি কবরের নীরবতা প্রমাণ করে যে মৃত্যু তাদের বন্ধন ছিন্ন করতে পারেনি।
৪. বিধাতার নিষ্ঠুরতার প্রতি অনুযোগ
- “অকরুণ দারুণ বিধি বিচার তোর কেমন / তোর বুঝি ভালোবাসার কেউ নাহি রে এমন…”বাউল দর্শনের স্বকীয় ঢঙে কবি নিয়তি বা বিধাতাকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। বিরহী হৃদয়ের দহন যে কতটা গভীর, তা বুঝতে না পারার জন্য বিধাতার প্রতি এক আন্তরিক অভিমান ঝরে পড়েছে।
৫. পল্লীকবির প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রত্যক্ষ অনুভব
- “পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বেদনার ছায়ায় নকসিকাঁথা লিখেছে তার মনেরি মায়ায়… পাগল বিজয় বলে, পরানে চায় রে আমি একবার গিয়ে শুনে আসি।”ভণিতায় গীতিকার জসীমউদ্দীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লোকবিশ্বাসের এমন এক স্তরে উপনীত হয়েছেন যেখানে রূপাইয়ের সেই বিরহী বাঁশি কেবল রূপকথা নয়, বাস্তব সত্য। বাউল কবি নিজে সেই মাঠে গিয়ে সেই কান্নার সুর স্বকর্ণে শুনে আসার আকুল ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সাহিত্যিক ও সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- আখ্যানকাব্যের সংগীতায়ন: একটি পূর্ণাঙ্গ দীর্ঘ আখ্যানকাব্যকে একটি সংক্ষিপ্ত লোকগীতিতে রূপান্তর করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। বিজয় সরকার অত্যন্ত দক্ষতায় পুরো কাহিনীর সারমর্ম ও ট্র্যাজেডি এই গানের অল্প কয়েকটি স্তবকে নিখুঁতভাবে গেঁথেছেন।
- জারিয়াঙ্গ ও কবিগানের টান: গানটির সুরকাঠামোতে কবিগান ও জারির গম্ভীর, প্রবহমান এবং বর্ণনামূলক সুরের প্রাধান্য রয়েছে। এতে দোতারা, সারিন্দা ও বেহালার করুণ সুর গানের শোকাবহ মেজাজকে তীব্র করে তোলে।
- সহজ লোকজ প্রকাশভঙ্গি: মেঠো বাংলার শব্দাবলি ব্যবহার করে এক মহাকাব্যিক শোককে জনসাধারণের জন্য সহজবোধ্য করে তোলা হয়েছে।
শিল্পী পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
- চারণকবি বিজয় সরকার (১৯০৩–১৯৮৫): নড়াইল জেলার ডুমুরতলায় জন্মগ্রহণকারী কবিয়াল বিজয় সরকার ছিলেন একাধারে গায়ক, গীতিকার ও সুরকার। প্রায় সহস্রাধিক গানের রচয়িতা এই চারণকবি লোকসংগীত ও ভাবসংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মরণোত্তর একুশে পদকে (২০১৩) ভূষিত হন। তাঁর রচিত “তুমি জানো না রে প্রিয়”, “এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে”-র মতো গানগুলো বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ।
- সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কেবল সাহিত্যের পাতায় নয়, বিজয় সরকারের এই গানের মাধ্যমে বাংলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এক লোকপুরাণে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ মেলা ও লোকগীতির আসরে এটি আজও সমান আবেগে গীত হয়।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- চারণকবি বিজয় সরকার রচনাবলী ও জীবনী, লোকসংস্কৃতি গবেষণা সেল।
- নকশী কাঁথার মাঠ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
- বৃহত্তর যশোর ও ফরিদপুরের কবিগান ও লোকসংগীত সমীক্ষা।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।







![সাজুর ব্যথায় আজও কাঁদে লিরিক্স - বিজয় সরকার [ Sajur bathai aj o kade ] 1 বিজয় সরকার - বাউল কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার এবং সুরকার](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2026/09/বিজয়-সরকার-বাউল-কণ্ঠশিল্পী-গীতিকার-এবং-সুরকার.png)





