সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৫:১৭ পিএম

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ইরানে একটি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনকে কেন্দ্র করে ২৯ বছর বয়সি সংগীতশিল্পী পারাস্তু আহমাদি এবং তাঁর সংগীতদলের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কোম প্রদেশের একটি আদালত সম্প্রতি এ রায় প্রদান করে, যা দেশটির অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন পারাস্তু আহমাদি “আজ খুনে জাভানানে ওয়াতান” শিরোনামের একটি সংগীত পরিবেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করেন। ওই পরিবেশনায় তিনি হিজাব ছাড়া অংশ নেন বলে অভিযোগ ওঠে। সরাসরি সম্প্রচারের ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ইরানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে এবং তাঁর সংগীত দলের কয়েকজন সদস্যকে আটক করে। কিছুদিন পর তারা মুক্তি পেলেও পরে তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়।
সম্প্রতি ঘোষিত আদালতের রায়ে বলা হয়, অভিযুক্তরা “অশালীন ও অনৈতিক বিষয়বস্তু” প্রচার করেছেন। এই অভিযোগে পারাস্তু আহমাদি এবং তাঁর সংগীতদলের আট সদস্যকে প্রত্যেককে ৭৪টি করে বেত্রাঘাতের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে দুই বছরের জন্য সংগীত পরিবেশনা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দেশত্যাগের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ঘটনার প্রধান দণ্ডাদেশ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিস্তারিত |
|---|---|
| অভিযুক্ত শিল্পী | পারাস্তু আহমাদি |
| সহকর্মীর সংখ্যা | ৮ জন |
| শাস্তির ধরন | প্রত্যেককে ৭৪টি বেত্রাঘাত |
| সংগীত পরিবেশনা নিষেধাজ্ঞা | ২ বছর |
| অতিরিক্ত শাস্তি | দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা |
এই রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও অধিকার বিষয়ক সংগঠন এ দণ্ডকে শিল্পী স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এটি কেবল একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভিন্নমত ও সাংস্কৃতিক প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতিফলন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা দাবি করেছে, একজন তরুণ সংগীতশিল্পীকে কেবল গান পরিবেশন এবং পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এমন শাস্তি দেওয়া ইরানের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। সংস্থাটি বলেছে, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক একটি দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে ইরানি আইনজীবী মইন খাজায়েলি মন্তব্য করেছেন যে, নারীদের সংগীত পরিবেশনকে অপরাধ হিসেবে ইরানের প্রচলিত আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাঁর মতে, এই ধরনের রায় আইনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোরতা বা অপব্যবহারের ইঙ্গিত দিতে পারে।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে প্রবাসী ইরানি শিল্পী ও মানবাধিকারকর্মীরাও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদি এবং নির্বাসিত অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকিসহ অনেকে এই রায়কে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, এই ধরনের শাস্তি শিল্পীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং সৃজনশীল প্রকাশের পরিসর সংকুচিত করে।
সাম্প্রতিক এই রায় ইরানে শিল্পী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি ঘিরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব দেশটির সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও শিল্পচর্চার ওপর কতটা পড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য