১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এবং ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক বিজয়ের লগ্নে সম্প্রচারিত এক অবিস্মরণীয় গণসংগীত “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কালজয়ী কাব্যকথা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আপেল মাহমুদের তেজোদীপ্ত ও আবেগমথিত সুর এবং সুরসম্রাজ্ঞী সাবিনা ইয়াসমিনের উদাত্ত কণ্ঠের মেলবন্ধনে গানটি বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক অনন্য সংগীতে পরিণত হয়।
Table of Contents
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে – সাবিনা ইয়াসমিন (কথা: গোবিন্দ হালদার, সুর: আপেল মাহমুদ)
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | এক সাগর রক্তের বিনিময়ে |
| গীতিকার | গোবিন্দ হালদার |
| সুরকার | আপেল মাহমুদ |
| মূল কণ্ঠশিল্পী | সাবিনা ইয়াসমিন |
| প্রথম প্রচারের তারিখ | ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ (বিজয় দিবসের সন্ধ্যায়) |
| প্রচার মাধ্যম | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র |
| সংগীতধারা | গণসংগীত / মুক্তিসংগীত / দেশাত্মবোধক গান |
| মূল উপজীব্য | শহীদদের সীমাহীন রক্তদান, স্বাধীনতার মূল্য, অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা ও দেশ গড়ার অঙ্গীকার |
| প্রাকৃতিক ও লোকজ অনুষঙ্গ | পদ্মা-মেঘনা, কিষাণ-কিষাণী, বাউলের একতারা ও আনন্দ ঝংকার |
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
আমরা তোমাদের ভুলব না।দুঃসহ এ বেদনার কণ্টক পথ বেয়ে
শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
আমরা তোমাদের ভুলব না।যুগের নিষ্ঠুর বন্ধন হতে
মুক্তির এ বারতা আনলে যারা
যুগের নিষ্ঠুর বন্ধন হতে
মুক্তির এ বারতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
ভুলব না… ভুলব না…এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
আমরা তোমাদের ভুলব না।কৃষাণ-কৃষাণীর গানে গানে
কৃষাণ-কৃষাণীর গানে গানে
পদ্মা-মেঘনার কলতানে
বাউলের একতারাতে
বাউলের একতারাতে
আনন্দ ঝংকারে
আনন্দ ঝংকারে
তোমাদের নাম ঝংকৃত হবে।
ঝংকৃত হবে… ঝংকৃত হবে… ঝংকৃত হবে….নতুন স্বদেশ গড়ার পথে
তোমরা চিরদিন দিশারী রবে।
নতুন স্বদেশ গড়ার পথে
তোমরা চিরদিন দিশারী রবে।
আমরা তোমাদের ভুলব না।।
ভুলব না….ভুলব না….ভুলব না…এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
আমরা তোমাদের ভুলব না।
Ek Shagor Rokter Binimoy (Romanized)
Ek sagor rokter binimoye
Banglar shadhinota anle jara
Amra tomader bhulbo na.
Amra tomader bhulbo na.
Dushshoho e bedonar kontok poth beye
Shosoner nagpash chhirle jara
Amra tomader bhulbo na.
Amra tomader bhulbo na.
Juger nisthur bondhon hote
Muktir e barta anle jara
Juger nisthur bondhon hote
Muktir e barta anle jara
Amra tomader bhulbo na.
Bhulbo na… bhulbo na…
Ek sagor rokter binimoye
Banglar shadhinota anle jara
Amra tomader bhulbo na.
Amra tomader bhulbo na.
Krishan-krishanir gane gane
Krishan-krishanir gane gane
Padma-Meghnar koltane
Bauler ektarate
Bauler ektarate
Anondo jhonkare
Anondo jhonkare
Tomader nam jhonkrit hobe.
Jhonkrit hobe… jhonkrit hobe… jhonkrit hobe….
Notun swadesh gorar pothe
Tomra chirodin dishari robe.
Notun swadesh gorar pothe
Tomra chirodin dishari robe.
Amra tomader bhulbo na.
Bhulbo na…. bhulbo na…. bhulbo na…
Ek sagor rokter binimoye
Banglar shadhinota anle jara
Amra tomader bhulbo na.
Amra tomader bhulbo na.
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. রক্তের মহাসমুদ্র ও স্বাধীনতার মূল্য
- “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা / আমরা তোমাদের ভুলবো না…”গানটির সূচনাই হয় ত্যাগের ব্যাপকতাকে নির্দেশ করে। ‘এক সাগর রক্ত’—এই অতলান্তিক উপমাটি একাত্তরের ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও অগণিত নির্যাতিত মানুষের আত্মত্যাগের প্রতীক। জাতির পক্ষ থেকে এই চরণে উচ্চারিত হয়েছে এক পবিত্র অঙ্গীকার: সময় বয়ে গেলেও বাংলাদেশ তার সূর্যসন্তানদের আত্মদানকে কখনোই বিস্মৃত হতে দেবে না।
২. শোষণের নাগপাশ ও ঐতিহাসিক দাসত্বমুক্তি
- “দুঃসহ এ বেদনার কণ্টক পথ বেয়ে শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা / যুগের নিষ্ঠুর বন্ধন হতে মুক্তির এ বারতা আনলে যারা…”এখানে দীর্ঘ চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনাকে ‘নাগপাশ’ (বিষাক্ত সাপের বাঁধন) হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যে পথ ধরে মুক্তিযোদ্ধারা হেঁটেছেন তা ছিল দুঃসহ বেদনায় ভরা কণ্টকময়। এই অমানবিক দাসত্ব ভেঙে তাঁরা পুরো জাতির জন্য স্বাধীনতার বার্তা বয়ে এনেছিলেন।
৩. প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতিতে শহীদের অমরত্ব
- “কিষাণ কিষাণীর গানে গানে / পদ্মা-মেঘনার কলতানে / বাউলের একতারাতে আনন্দ ঝঙ্কারে / তোমাদের নাম ঝংকৃত হবে…”শহীদদের স্মৃতি কোনো পাথরের সৌধে বন্দি থাকবে না; তা মিশে যাবে আবহমান বাংলার জনজীবনে। শ্রমজীবী মানুষের ঘামে, চিরচেনা নদীগুলোর তরঙ্গে এবং বাউলের একতারার লোকজ সুরে তাঁদের নাম সর্বদা স্পন্দিত হবে। এটি মৃত্যুর ওপর জীবনের এবং লোকায়ত সংস্কৃতির মাধ্যমে অমরত্বের এক নান্দনিক প্রকাশ।
৪. বিনির্মাণের দিশারী
- “নতুন স্বদেশ গড়ার পথে তোমরা চিরদিন দিশারী রবে…”যুদ্ধের ময়দানে বিজয় অর্জনই শেষ কথা নয়; যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ে তোলাই হলো পরবর্তী সংগ্রাম। সেই পুনর্গঠনের প্রতিটি ধাপে শহীদদের আত্মত্যাগই জাতিকে পথ দেখাবে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা যোগাবে।
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক উপমা: ‘এক সাগর রক্ত’, ‘শোষণের নাগপাশ’ এবং ‘কণ্টক পথ’—শব্দাবলি কেবল কাব্যিক নয়, এগুলো ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব দলিল হিসেবে কাজ করে।
- লোকায়ত ও প্রাকৃতিক সংযোগ: জাতীয় মুক্তির গানকে নদী (পদ্মা-মেঘনা), শ্রমজীবী মানুষ (কিষাণ-কিষাণী) ও লোকযন্ত্রের (একতারা) সাথে মিলিয়ে দিয়ে গীতিকার গোবিন্দ হালদার গানটিকে মাটির কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছেন।
- প্রতিজ্ঞার সংহত প্রকাশ: “আমরা তোমাদের ভুলবো না”—এই চরণের দৃঢ় ও বারংবার পুনরাবৃত্তি গানটিতে এক গম্ভীর শপথের দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কীর গভীরতা
- সাবিনা ইয়াসমিনের প্রক্ষেপণ ও গায়কী: সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠের স্ফটিকস্বচ্ছ মাধুর্য, গভীর আবেগ এবং তীব্র জাতীয়তাবাদী স্পন্দন গানটিকে অতুলনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে উচ্চ সপ্তকে তাঁর স্বরপ্রক্ষেপণ শ্রোতার হৃদয়ে গভীর দেশপ্রেম ও শ্রদ্ধা জাগ্রত করে।
- আপেল মাহমুদের সুরের চাল: আপেল মাহমুদ গানটিতে বিষাদ ও উদ্দীপনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। গানটির সুর কেবল শোকগাথা নয়, এতে রয়েছে বিজয়ের আনন্দ এবং মার্চিংধর্মী এক প্রত্যয়দীপ্ত গতি। কোরাস ও অর্কেস্ট্রেশনের চমৎকার মিশ্রণ গানটিকে গণসংগীতের অনন্য মানে উন্নীত করেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্রষ্টাদের অবদান
- ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর মাহেন্দ্রক্ষণ: গানটির ইতিহাস সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাথে জড়িত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে যখন ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিওতে আনন্দ ও কান্নার এক অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেদিন সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত অন্যতম শীর্ষ গান ছিল এটি, যা স্বাধীন দেশের মাটিতে এক নতুন প্রভাতের আগমনকে চিহ্নিত করেছিল।
- গোবিন্দ হালদার (১৯৩০–২০১৫): কলকাতার এই নিভৃতচারী গীতিকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিজের আত্মার লড়াই বলে মনে করতেন। বন্ধু কামাল আহমেদের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতারের কামাল লোহানীর কাছে তিনি একাত্তরে নিজের লেখা ১৫টি গানের একটি খাতা তুলে দেন। “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে”, “পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে” এবং “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”-র মতো মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ গানগুলো তাঁরই কলমে রচিত।
- আপেল মাহমুদ ও সাবিনা ইয়াসমিন: সুরকার আপেল মাহমুদ রণাঙ্গনে ৩ নম্বর সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধ করার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এসে সুরের অস্ত্র তুলে নেন। আর সাবিনা ইয়াসমিন তাঁর অনন্য কণ্ঠে গানটিকে চিরকালের জন্য জাতীয় আবেগের স্তরে রূপায়িত করেন।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
উৎস ও তথ্যসূত্র
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও মুক্তিযুদ্ধের গান, ড. সুকুমার বিশ্বাস।
- গোবিন্দ হালদারের গান ও মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংগ্রহশালা।
- একাত্তরের শব্দসৈনিক স্মারকগ্রন্থ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র দলিলমালা।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।







![এক সাগর রক্তের বিনিময়ে লিরিক্স [ Ek Sagor Rokter Binimoye Lyrics ] - সাবিনা ইয়াসমিন [ Sabina Yasmin ] 1 সাবিনা ইয়াসমিন](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2026/03/৪৪-বছর-পর-আবারও-ফিরে-এলো-সাবিনা-ইয়াসমীনের-কালজয়ী-গান.jpg)


![কথা বা বানী download 97 আমার হৃদয় একটা লিরিক্স [ Amar Hridoy Ekta Lyrics ] । এন্ড্রু কিশোর এবং কনক চাঁপা । Andrew Kishore & Kanak Chapa](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/06/download-97-1024x536.png)


