সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২২, ৭:৪ পিএম

বাংলা গানের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়’ (যা অনেকে ‘পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধায়’ লাইনটি দিয়েও খুঁজে থাকেন)। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কালজয়ী সৃষ্টিটি আধুনিককালে নতুন করে বিপুল শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে ওপার বাংলার বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্রের অনন্য গায়কীতে। তাঁর ‘আনন্দ সন্ধ্যা’ অ্যালবামে স্থান পাওয়া এই গানটি বসন্তের চিরন্তন রূপ এবং মনের মুক্তিকে এক অদ্ভুত মায়াবী আবহে ফুটিয়ে তুলেছে।
Table of Contents
| গানের নাম | ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান |
| শিল্পী | লোপামুদ্রা মিত্র |
| গীতিকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| অ্যালবাম | আনন্দ সন্ধ্যা |
| গানের পর্যায় | প্রকৃতি পর্যায় (বসন্ত) |
এই সুপরিচিত গানটি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি পর্যায়ের একটি অসাধারণ সৃষ্টি, যা ১৯২২ সালে (১৩২৮ বঙ্গাব্দে) রচিত হয়েছিল। গানটির সুর শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবের আবহকে ধারণ করে। লোপামুদ্রা মিত্র তাঁর স্বাতন্ত্র্যসূচক কণ্ঠশৈলী এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম মেলবন্ধনে গানটিকে রেকর্ডিং করেন, যা সমসাময়িক তরুণ প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের আবেদনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
শিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈশব থেকেই শাস্ত্রীয় ও লোকসংগীতের আবহে বেড়ে ওঠেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে জীবনমুখী আধুনিক গান, কবিতা থেকে গান এবং রবীন্দ্রসংগীতের মেলোডিতে তিনি দুই বাংলায় নিজস্ব স্থান তৈরি করেন। প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক জয় সরকারের সাথে তাঁর সাঙ্গীতিক ও জীবনসঙ্গী হিসেবে কাজের রসায়ন বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বসন্তের আগমনী ও রূপকের মোড়কে মানুষের অন্তর্নিহিত বাঁধনহারা মনের আকুতি লোপামুদ্রার কণ্ঠে এই গানে চমৎকারভাবে মূর্ত হয়েছে।
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
আমার আপনহারা প্রাণ
আমার বাঁধন-ছেঁড়া প্রাণ
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।
তোমার অশোকে কিংশুকে
অলক্ষ্য রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে।
তোমার ঝাউয়ের দোলে
মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান।
পূর্ণিমা সন্ধ্যায়, তোমার রজনীগন্ধায়
রূপসাগরের পারের পানে উদাসী মন ধায়।
তোমার প্রজাপতির পাখা
আমার আকাশ-চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন স্বপন-মাখা।
তোমার চাঁদের আলোয়
মিলায় আমার দুঃখ-সুখের সকল অবসান।
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
আমার আপনহারা প্রাণ
আমার বাঁধন-ছেঁড়া প্রাণ
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।
Fagun haway haway korechi je daan
Tomar haway haway korechi je daan
Amar apon hara praan
Amar badhon chera praan
Tomar haway haway korechi je daan.
Tomar ashoke kingshuke
Alokhyo rong laglo amar okaroner sukhe.
Tomar jhau-er doley
Mormoriya uthey amar dukkho-raater gaan.
Purnima sondhay tomar rojonigondhay
Rupsagor-er parer paane udashi mon dhaay.
Tomar projapotir pakha
Amar akash chaowa mugdho chokher rongeen swapan makha.
Tomar chander aaloy
Milay aamar dukkho-sukher sokol obosan.
Tomar haway haway korechi je daan
Phagun haway haway korechi je daan
Amar apon hara praan
Amar badhon chera praan
Tomar haway haway korechi je daan.
গানটির সুরের মূল ভিত্তি হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের মিশ্র বাউল অঙ্গ এবং কাহারবা তালের চটুল লয়। বসন্তের আগমনকে উদযাপনের জন্য সুরের মধ্যে এক ধরণের চপলতা ও উচাটন ভাব তৈরি করা হয়েছে। লোপামুদ্রা মিত্রের এই সংস্করণে ঐতিহ্যবাহী একতারা বা দোতারার পাশাপাশি অ্যাকোস্টিক গিটার ও পরিমিত পারকাশন ব্যবহার করা হয়েছে, যা গানটির আদি মেলোডিকে অক্ষুণ্ণ রেখেও একটি আধুনিক ও উৎসবমুখর মাত্রা দেয়।
গানের মূল ভাবটি আবর্তিত হয়েছে বসন্তের রঙে নিজের আত্মাকে বিলীন করে দেওয়ার এক আধ্যাত্মিক ও জাগতিক আনন্দকে কেন্দ্র করে। অশোক, কিংশুক (পলাশ) ফুল, ঝাউবনের মর্মর ধ্বনি এবং প্রজাপতির পাখার রঙের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি কীভাবে মানুষের মনের বিষাদকে ধুয়ে মুছে দেয়—সেটিই কবি এখানে প্রকাশ করেছেন। পূর্ণিমা সন্ধ্যার রজনীগন্ধার সুবাস এবং চাঁদের আলো যেন মানুষের জীবনের সমস্ত ‘দুঃখ-সুখের অবসান’ ঘটিয়ে এক পরম প্রশান্তি এনে দেয়, যা মূলত প্রকৃতির সাথে মানুষের একাত্ম হওয়ারই গান।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো লোপামুদ্রা মিত্রের মুক্ত, জোরালো এবং দরাজ কণ্ঠের পরিবেশনা। সাধারণ রবীন্দ্রসংগীতের ধীর গায়কী থেকে বেরিয়ে এসে তিনি এর মধ্যে যে প্রবল উদ্দীপনা ও প্রাণের সঞ্চার করেছেন, তা শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। সুরের ওঠা-নামায় তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ এবং গিটারে কর্ডের চমৎকার ব্যবহার গানটিকে সমসাময়িক বাংলা গান ও মণ্ডপ উৎসবগুলোর অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই নিবন্ধের তথ্যসমূহ রবীন্দ্র-রচনাবলী (গীতবিতান, প্রকৃতি পর্যায়), লোপামুদ্রা মিত্রের অফিশিয়াল অ্যালবাম ‘আনেন্দ সন্ধ্যা’র ডিসকোগ্রাফি, বিশ্বভারতী সংগীত বোর্ড ও বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের (BFJA) প্রামাণ্য নথিপত্র এবং সংগীত গবেষকদের বিভিন্ন বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য