সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই অক্টোবর ২০২২, ৭:৯ পিএম

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অডিও বাজার শাসন করা একচ্ছত্র এক জাদুকরের নাম প্রিন্স মাহমুদ। তিনি কেবল একজন গীতিকার, সুরকার কিংবা সঙ্গীত পরিচালক নন; তিনি মূলত এক একটা কালজয়ী ইতিহাসের রূপকার। জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, খালিদ থেকে শুরু করে সে আমলের প্রায় প্রতিটি কিংবদন্তি ব্যান্ড তারকার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা আবেগি গানগুলোর জন্ম হয়েছে প্রিন্স মাহমুদের ক্ষুরধার কলম আর মায়াবী সুরে। ক্যাসেটের যুগে তাঁর নাম লেখা মিক্সড অ্যালবাম বাজারে আসা মানেই ছিল শ্রোতাদের দোকানে লাইন ধরা আর দেদারসে ক্যাসেট বিক্রি হওয়া।
Table of Contents

খুলনা জেলায় জন্ম নেওয়া প্রিন্স মাহমুদের গানের প্রতি ঝোঁকটা তৈরি হয়েছিল একদম ছেলেবেলায়। তবে তাঁর এই পথচলাটা খুব সহজ ছিল না। পরিবারের খুব একটা ইচ্ছে না থাকায়, অনেকটা আড়ালে-অগোচরেই লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে গান শিখতে এবং গান করতে হয়েছিল।
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি ব্যান্ডের নেশায় জড়িয়ে পড়েন। নব্বইয়ের দশকের একেবারে শেষ প্রান্তে ‘দি ব্লুজ’ (The Blues) নামের একটি ব্যান্ডের ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট হিসেবে সঙ্গীতের ভুবনে তাঁর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর তিনি পুরোপুরি মন দেন গান লেখা ও কম্পোজিশনের দিকে। এর পরপরই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি নিজেই গঠন করেন ‘ফ্রম ওয়েস্ট’ (From West) নামক একটি নতুন ব্যান্ড। এই ব্যান্ডের লিডার ও মূল গায়ক ছিলেন তিনি নিজেই। সে সময় স্বৈরাচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তাঁর একটি গান তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যার কথাগুলো ছিল—“রাজাকার আলবদর কিছুই রইবো নারে / উপরে দালাল ভিতরে চোর কিছুই হইবো নারে / সব রাজাকার ভাইসা যাইবো বঙ্গোপসাগরে”। ‘ফ্রম ওয়েস্ট’-এর প্রথম অ্যালবামের নাম ছিল ‘সে কেমন মেয়ে’।
ব্যান্ডের চেনা বৃত্ত ছেড়ে প্রিন্স মাহমুদ যখন এককভাবে অডিও অ্যালবামের প্রজেক্ট করা শুরু করলেন, তখনই মূলত বাংলা অডিও ইন্ডাস্ট্রির চেহারা বদলে যায়। ১৯৯৫ সালে ‘শক্তি’ অ্যালবামের মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম মিশ্র (মিক্সড) শিল্পীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। এরপর ‘ক্ষমা’, ‘ঘৃণা’, ‘দাগ থেকে যায়’, ‘পিয়ানো’র মতো একের পর এক সুপারহিট মিক্সড অ্যালবাম উপহার দিয়ে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান। একক, দ্বৈত ও মিক্সড মিলিয়ে এযাবৎ তাঁর প্রকাশিত ৪০তম অ্যালবামের নাম ‘নিমন্ত্রণ’।
পড়াশোনার জীবনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করা এই সুরকারের লিরিক্সে তাই সবসময়ই পাওয়া যেত এক অদ্ভুত কাব্যিক গভীরতা, যা শ্রোতাদের বুকের ভেতর সরাসরি দাগ কাটত।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রিন্স মাহমুদ তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সময়ের সাথে সাথে ক্যাসেটের ফিতা আর সিডির যুগ পেরিয়ে গান আজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে এসেছে। কিন্তু প্রিন্স মাহমুদের তৈরি করা গানগুলোর আবেদন আজও এক চুলও কমেনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জেমস বা আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে তাঁর লেখা গানগুলো বাঙালিকে ঠিক একইভাবে কাঁদাবে, হাসাবে এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করবে। তিনি প্রচারের আলো থেকে একটু দূরে থাকতে ভালোবাসলেও, এদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মন্তব্য