পরেশ ধর | বাঙালি কবি, গণসংগীত গীতিকার, গীতিনাট্যকার, লেখক, বংশীবাদক, যাত্রাপালা রচয়িতা, রাজনীতিক এবং মাওবাদী চিন্তক

বিশ শতকের বাংলার বুক জুড়ে যখন একের পর এক আন্দোলন, তেভাগা, দেশভাগ আর নকশালবাড়ির উত্তাল হাওয়া বইছে—ঠিক সেই সময়ে কিছু মানুষ ড্রয়িংরুমের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে মিশে গিয়েছিলেন মাটির মানুষের মিছিলে। তাঁদেরই একজন পরেশ ধর। তিনি কেবল একজন কবি বা লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে গণসঙ্গীতের কালজয়ী গীতিকার, গীতিনাট্যকার, কুশলী বংশীবাদক, যাত্রাপালার রচয়িতা এবং একজন খাঁটি মাওবাদী চিন্তক। পশ্চিমবঙ্গ গণ-সংস্কৃতি পরিষদ এবং বিপ্লবী লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী সংঘের হাত ধরে তিনি আজীবন লড়ে গেছেন মেহনতি মানুষের পক্ষে। তৎকালীন এম. সি. সি. (M.C.C.)-র রাজনীতির অনুসারী এই মানুষটি নিজের জীবনের সমস্ত আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সুর আর শব্দকে বানিয়েছিলেন প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার।

পরেশ ধর | বাঙালি কবি, গণসংগীত গীতিকার, গীতিনাট্যকার, লেখক, বংশীবাদক, যাত্রাপালা রচয়িতা, রাজনীতিক এবং মাওবাদী চিন্তক

 

পরেশ ধর | বাঙালি কবি, গণসংগীত গীতিকার, গীতিনাট্যকার, লেখক, বংশীবাদক, যাত্রাপালা রচয়িতা, রাজনীতিক এবং মাওবাদী চিন্তক
পরেশ ধর

 

শিকড়ের সন্ধান, শৈশব ও মেধার আলো

১৯১৮ সালের ৯ আগস্ট, ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় জন্ম নেন পরেশ ধর। তবে তাঁদের নাড়ি পোঁতা ছিল অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের ঐতিহাসিক কাননীসার গ্রামে। পিতা যামিনীকান্ত ধর এবং মা তুলসীরানি দেবীর এই সন্তান পড়াশোনায় ছিলেন ভীষণ মেধাবী। কলকাতার বিখ্যাত ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে পাস করার পর তিনি ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি লাভ করেন।

উচ্চশিক্ষার এই চেনা ছকে পা মেলালেও, পরেশ ধরের আসল টানটা ছিল অন্য জায়গায়। তাঁদের পারিবারিক পরিবেশ ছিল আগাগোড়া সঙ্গীতমুখর। ঘরের ভেতরেই কাকার হাত ধরে তাঁর রাগ সঙ্গীতের প্রথম পাঠ শুরু হয়। সুরের সেই ক্ষুধা তাঁকে পরবর্তীতে নিয়ে যায় জোড়াবাগানের ওস্তাদ রামকানাই ভট্টাচার্যের কাছে, যাঁর কাছ থেকে তিনি সঙ্গীতের কঠোর তালিম নেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি আকাশবাণী কলকাতায় নিয়মিত বাঁশি বাজানো শুরু করেন। বাঁশির ওপর তাঁর এমন অবিশ্বাস্য দখল ছিল যে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নৃত্যশিল্পী উদয়শংকরের বিখ্যাত দলে তিনি একজন প্রধান বংশীবাদক হিসাবে যুক্ত হয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন।

গণনাট্য সংঘ, সরকারের রোষানল ও এক আপসহীন পথচলা

১৯৪৬ সাল। বাংলায় তখন পরিবর্তনের হাওয়া। পরেশ ধর যোগ দিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (IPTU)। বাঁশির চেনা সুর ছেড়ে তাঁর কলম হয়ে উঠল এক একটা ধারালো তলোয়ার। শোষিত মানুষের পক্ষে তাঁর লেখা গানগুলো এত বেশি শক্তিশালী ছিল যে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর গদি কেঁপে উঠেছিল।

তাঁর লেখা বিখ্যাত ‘কারখানা কলে’ গানটি সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে তীব্র উদ্দীপনা তৈরি করায় ব্রিটিশ সরকারের কোপানলে পড়ে। আকাশবাণী বেতার কর্তৃপক্ষ গানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং বাজারে থাকা এই গানের সমস্ত রেকর্ড খুঁজে খুঁজে নষ্ট করে ফেলা হয়। এমনকি গানটির বিক্রিও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু পরেশ ধর ছিলেন আপসহীন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে যখন তিনি দেখলেন গণনাট্য সংঘের মূল মতাদর্শে কিছুটা চিড় ধরেছে, তখন আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস না করে তিনি একাই দল থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর থেকে সম্পূর্ণ নিজের তাগিদে, একক শক্তিতে তিনি গান ও নাটক রচনা চালিয়ে যেতে থাকেন। জীবিকার তাগিদে বিখ্যাত মিউজিক কোম্পানি এইচ.এম.ভি. (HMV)-তে কিছুকাল ট্রেইনার বা প্রশিক্ষকরূপে কাজ করেছিলেন তিনি।

সৃষ্টির খতিয়ান: চারশো গানের এক জাদুকর

পরেশ ধরের সৃষ্টির ঝুলি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি প্রায় চারশো গান রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে দুই শতাধিক গানই ছিল খাঁটি গণসঙ্গীত। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুখের ভাষা তিনি তুলে এনেছিলেন তাঁর লিরিক্সে। তাঁর লেখা কালজয়ী গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, বেচু দত্ত, বাণী ঘোষাল এবং সুপ্রীতি ঘোষের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা।

সাহিত্য ও নাটকের আঙিনাতেও তাঁর পদচারণা ছিল রাজকীয়। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

  • তিন খণ্ডে একগুচ্ছ গণসংগীত (যা সে যুগের আন্দোলনকারীদের জন্য ছিল এক একটা বাইবেল)

  • আমি যে রোজ দেখি আমার মাকে

  • অসংখ্য বাসুদেবের পদধ্বনি

এছাড়া নাটকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি রচনা করেছিলেন তিনটি অনবদ্য গীতিনাট্য—‘দুর্ভিক্ষের পাঁচালী’, ‘শান্তি তরজা’ এবং ‘ভোট রঙ্গ’।

পরেশ ধর | বাঙালি কবি, গণসংগীত গীতিকার, গীতিনাট্যকার, লেখক, বংশীবাদক, যাত্রাপালা রচয়িতা, রাজনীতিক এবং মাওবাদী চিন্তক
পরেশ ধর

মহাপ্রয়াণ ও এক চিরন্তন উত্তরাধিকার

যিনি আজীবন ক্ষমতার বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন, মাওবাদী দর্শনে বিশ্বাস রেখে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন, সেই ক্ষণজন্মা মানুষটি ২০০২ সালের ৬ এপ্রিল এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন।

আজকের দিনে হয়তো ইন্টারনেটের পাতায় কিংবা মূলধারার ইতিহাসে পরেশ ধরের নাম খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু বাংলায় যখনই কোনো গণআন্দোলন হয়, মেহনতি মানুষ যখনই নিজের অধিকারের জন্য মিছিলে নামে, তখন অলক্ষ্যে পরেশ ধরের সেই গান আর তাঁর বাঁশির বিদ্রোহী সুর এক অদৃশ্য শক্তি হয়ে মিশে থাকে প্রতিটি স্লোগানে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আপসহীন বিপ্লবী সত্তা আজও বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।

Leave a Comment