বাংলা গানের জগতে প্রীতম আহমেদ কেবল একজন গায়ক, গীতিকার কিংবা সুরকার নন; তিনি মূলত এক ক্ষুরধার প্রতিবাদের নাম। যেখানেই অন্যায়, সমাজ বা রাজনীতির অসঙ্গতি—সেখানেই প্রীতমের কণ্ঠ গর্জে উঠেছে জীবনমুখী গানের চড়া সুরে। তবে তাঁর পরিচয় শুধু গানের খাতার ভেতরেই আটকে নেই। তিনি একাধারে অভিনেতা, লেখক, সাংবাদিক এবং সমাজকর্মী। গত কয়েক বছর ধরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন ব্রিটিশ ও হলিউডের মূলধারার চলচ্চিত্রে। বর্তমানে ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও, বুকের ভেতরের বাঙালি সত্তা আর দ্রোহটাকে তিনি সবসময় বাঁচিয়ে রেখেছেন সগৌরবে।
Table of Contents
প্রীতম আহমেদ: গানের চারণকবি, অভিনেতা ও এক প্রতিবাদী সত্তা

শৈশব, সুরের দীক্ষা ও উচ্চশিক্ষা
২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় জন্ম নেন প্রীতম আহমেদ। ছোটবেলা থেকেই মিউজিকের প্রতি ছিল তাঁর এক অদ্ভুত টান। গানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকার সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে, যেখান থেকে তিনি নজরুল সঙ্গীতে দীক্ষা লাভ করেন।
তবে শুধু দেশীয় সুরে আটকে থাকেননি প্রীতম। সুরের সন্ধানে তিনি দূর সুদূর ‘নিউ ইয়র্ক গিটার একাডেমি’ থেকে স্প্যানিশ ফ্লেমিঙ্গো গিটারের ওপর পড়াশোনা করেন। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি’ থেকে মিউজিকের ওপর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করছেন।
প্রভাব ও প্রতিবাদী গানের চারণভূমি
কিশোর বয়স থেকেই প্রীতম আহমেদ প্রভাবিত হয়েছিলেন কবীর সুমন, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, ওস্তাদ রাশিদ খানের মতো শাস্ত্রীয় ও জীবনমুখী সঙ্গীতজ্ঞদের দ্বারা। একই সাথে বব ডিলান, বিবি কিং কিংবা স্টিভ র্যাভনের মতো পশ্চিমা কিংবদন্তিদের দর্শনও তাঁর মগজে দারুণভাবে দাগ কেটেছিল।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো—প্রেম-বিরহের চেনা বাণিজ্যিক ছক ভেঙে প্রীতম হয়ে উঠলেন সমসাময়িক প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। ঢাকার সদরঘাটে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা দর্জি বিশ্বজিৎ, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা কিশোরী ফেলানী, গাজীপুরে বাসে আগুনে পুড়িয়ে মারা মনির, দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের শিকার হওয়া দামিনী (নির্ভয়া), কিংবা পুরুলিয়ার লিঙ্গ বিতর্কের মুখে পড়া ক্রীড়াবিদ পিংকি প্রামাণিক—এই সমস্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো প্রীতমকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তিনি এগুলোর বিরুদ্ধে গান বাঁধেন, সুর তোলেন।
এযাবৎ তাঁর মোট ১২টি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম একজন সংগঠক ছিলেন তিনি। শুধু রাজপথের আন্দোলনে যোগ দেওয়াই নয়, আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করতে তিনি বেশ কিছু দুর্দান্ত গান লিখেছিলেন ও সুর করেছিলেন, যা তখন তরুণদের মাঝে মস্ত বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
গানের বাইরে বহুমুখী ক্যারিয়ার: ‘গানওয়ালা’ ও সাহিত্য
প্রীতমের ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে আছে গণমাধ্যম। শুরুর দিকে তিনি বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন ‘চ্যানেল আই’-এ একজন সফল অনুষ্ঠান নির্মাতা (প্রডিউসার) হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের একটি স্টুডিও এবং প্রোডাকশন হাউস গড়ে তোলেন, যার নাম দেন ‘গানওয়ালা’। এছাড়া অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘মিডিয়াটাইমস টোয়েন্টিফোর ডট কম’-এর সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেখালিখির অভ্যেসটা প্রীতমের মজ্জাগত। ২০১৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় র্যামন পাবলিশার্স থেকে তাঁর একটি চমৎকার কবিতার বই প্রকাশিত হয়, যার নাম ‘জন্মদাগ’।
হলিউড ও ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে নতুন অধ্যায়
বর্তমানে প্রীতম আহমেদ যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। আর সেখানেই তাঁর ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে এক অবিশ্বাস্য পালক। ব্রিটিশ এবং হলিউডের মূলধারার চলচ্চিত্রে তিনি এখন একজন নিয়মিত মুখ। ওখানকার নামী দামী কাস্টিং ডিরেক্টরদের নজর কেড়েছেন তিনি। সম্প্রতি বিবিসি (BBC)-এর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত সিরিজ ‘এ ভেরি ব্রিটিশ স্ক্যান্ডাল’ (A Very British Scandal)-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের জাত চিনিয়েছেন।

গিটার হাতে সদরঘাটের বিশ্বজিতের জন্য গান বাঁধা প্রীতম আর লন্ডনের স্টুডিওতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো প্রীতমের মধ্যে আসলে কোনো তফাত নেই। পরিচয় ও কাজের পরিধি বদলালেও প্রীতম আহমেদ সবসময় তাঁর শিকড় আর প্রতিবাদের ভাষার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। একজন বাঙালি শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর এই দাপুটে পথচলা সত্যিই আমাদের গর্বিত করে।
