আবহমান বাংলার বাউল ও বিচ্ছেদ গানের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও বেদনাবিধুর একটি সৃষ্টি “বিষের জ্বালায় আজ আমি”। প্রখ্যাত বাউল সাধক, সুরকার ও গীতিকার আক্কাস দেওয়ানের কথা ও সুরে রচিত এই গানটিতে প্রেমাস্পদের নিষ্ঠুর অবহেলা, তীব্র অন্তর্দহন এবং একাকীত্বের হাহাকারকে চিরন্তন লোকজ রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
বাউল গানের আসর থেকে শুরু করে সাধারণ সংগীতপ্রেমীদের কাছে গানটি বিরহের এক নিখাদ রূপ হিসেবে সমাদৃত, যেখানে জাগতিক ভালোবাসার আঘাত এবং আধ্যাত্মিক আর্তি এক মোহনায় এসে মিশেছে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | বিষের জ্বালায় আজ আমি |
| গীতিকার ও সুরকার | আক্কাস দেওয়ান (Akkas Dewan) |
| সংগীতধারা | বাংলা লোকসংগীত / বাউল বিচ্ছেদ গান ও মরমি ভাবগীতি |
| সুরশৈলী | করুণ রসপ্রধান বিচ্ছেদী সুর ও মেঠো বাউল তান |
| মূল উপজীব্য | বিরহের তীব্র দহন, বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা, একাকীত্ব ও নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন |
| প্রধান লোকজ রূপক | বিষের তীর, ডানা ভাঙা পাখি, নীড়হীনতা ও কলিজা চৌচির |
| আঞ্চলিক ব্যাপ্তি | ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ সমগ্র দেওয়ানী গানের বলয় |
বিষের জ্বালায় আজ আমি [ Bisher Jalay Aj Ami ]
যারে খুজি তারে নাই…!!
Bisher Jalay Aj Ami
Ke jeno amar buke, marlo bish-er tir,
Bisher jwalay aj ami, hoiyachi osthir!
Byatha kar kache janay,
Ke bujhbe moner byatha, se to kache nai!
Jare khuji tare nai,
Shoto loker bhir.
Hay re nithur bondhu, doyama-yahin,
Khobor to nilana re bondhu, kivabe jai din!
Diyachho phanki,
Ami jeno dana bhanga ahoto pakhi,
Sathi-hara pakhir moto,
Khuje na pai nir.
Boro asha chhilo mone, bondhur shone,
Bhalobese ghor badhibo shong gopone.
O, Kede Akkas Dewan koi,
Ei ki re bondhu, tomar premer porichoy!
Bisher tir marili buke,
Kolija chochir.
গানের মূল ভাব
“বিষের জ্বালায় আজ আমি” গানটির মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসায় প্রতারিত ও উপেক্ষিত হৃদয়ের অবর্ণনীয় রক্তক্ষরণ। বাউল দর্শনে ভালোবাসা কেবল সাধারণ মানবীয় আকর্ষণ নয়, এটি আত্মিক সমর্পণের এক পরম সাধনা। কিন্তু সেই ভালোবাসার মানুষটিই যখন নির্দয় হয়ে আঘাত হানে, তখন সেই যন্ত্রণা শারীরিক ক্ষতের চেয়েও মারাত্মক বিষে পরিণত হয়।
গানটিতে শত মানুষের ভিড়েও এক পরম একাকীত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রেমিকের অবস্থা তুলনা করা হয়েছে ঝড়ে ডানা ভেঙে যাওয়া সেই পাখির সাথে, যার ওড়ার শক্তি নেই এবং আশ্রয়ের জন্য কোনো নীড়ও খুঁজে পায় না। নিভৃতে ঘর বাঁধার আজন্ম স্বপ্ন যখন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তখন বিষাক্ত তীরের আঘাতে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হওয়া ছাড়া আর কোনো সান্ত্বনা অবশিষ্ট থাকে না।
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. অদৃশ্য আঘাত ও নিঃসঙ্গ অস্থিরতা
- “কে যেনো আমার বুকে মারলো বিষের তীর / বিষের জ্বালায় আজ আমি হইয়াছি অস্থির / ব্যথা কার কাছে জানাই, কে বুঝিবে মনের ব্যথা সে তো কাছে নাই…”গানটির সূচনাই হয় অন্তরের অদৃশ্য ক্ষতের প্রকাশ দিয়ে। ভালোবাসার আঘাত কোনো দৃশ্যমান অস্ত্রের আঘাত নয়, এটি অন্তরে বিষ ঢেলে দেওয়ার মতো। চারপাশের শত মানুষের ভিড়েও ব্যথার কথা বলার মতো কোনো আপনজন থাকে না, কারণ যে ক্ষত তৈরি করেছে সে নিজেই আজ অনুপস্থিত।
২. নিঠুর বন্ধুর অবহেলা ও নীড়হীন পাখি
- “হায়রে নিঠুর বন্ধু দয়া মায়াহীন, খবর তো নিলানা রে বন্ধু কিভাবে যায় দিন / দিয়াছ ফাঁকি, আমি যেন ডানা ভাঙা আহত পাখি / সাথীহারা পাখির মতো খুঁজে না পাই নীড়…”প্রেমাস্পদের উদাসীনতাকে এখানে নির্দয়তার চরম রূপ হিসেবে দেখা হয়েছে। ডানা ভাঙা পাখির রূপকটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী—উড়তে না পারা আহত পাখি যেমন অসহায়ভাবে মাটিতে ছটফট করে, তেমনি ভালোবাসার আশ্রয় হারিয়ে প্রেমিকও জীবনের অবলম্বনহীন হয়ে পড়ে।
৩. স্বপ্নভঙ্গ ও ভণিতার আর্তি
- “বড় আশা ছিলো মনে বন্ধুর সনে, ভালোবেসে ঘর বাঁধিবো সঙ্গ গোপনে / কেঁদে আক্কাস দেওয়ান কয় এই কি রে বন্ধু তোমার প্রেমের পরিচয় / বিষের তীর মারিলি বুকে কলিজা চৌচির…”গানটির ভণিতায় গীতিকার আক্কাস দেওয়ান নিজের নাম জড়িয়ে এক মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন। নিভৃতে সংসার পাতার পবিত্র স্বপ্নের বিপরীতে প্রতিদান হিসেবে পাওয়া প্রতারণা ও নিষ্ঠুরতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। অন্তরের গভীরতম অনুভূতির এই বিনাশই প্রেমিকের কলিজাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য
- চিরায়ত দেওয়ানী ভণিতা: পদাবলী ও বাউল রীতির ঐতিহ্য মেনে গানের শেষ চরণে রচয়িতা আক্কাস দেওয়ান নিজের নাম উল্লেখ করে সরাসরি প্রেমাস্পদ বা পরমাত্মার কাছে অনুযোগ ব্যক্ত করেছেন।
- পাখির চিরন্তন লোকজ রূপক: লোকসাহিত্যে আত্মা বা মনকে প্রায়শই পাখির সাথে তুলনা করা হয়। এখানে ‘ডানা ভাঙা পাখি’ ও ‘নীড়হীনতা’-র রূপকটি ব্যবহার করে অস্তিত্বের সংকটকে নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
- সহজিয়া প্রকাশভঙ্গি: জটিল তাত্ত্বিক ভাষা পরিহার করে গ্রামীণ মুখের মেঠো শব্দাবলি (“কলিজা চৌচির”, “হইয়াছি অস্থির”) ব্যবহারের ফলে গানটির বেদনা অত্যন্ত সরাসরি শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের আবেদন
- বাউল বিচ্ছেদ সুরের চলন: গানটি ধীর থেকে মধ্যম লয়ের বিচ্ছেদী চালে গীত হয়। সুরের মধ্যে এক ধরণের কান্নার দোলা ও আহাজারি থাকে, যা সুরের তান ও মীড়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।
- লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণ: দোতারা, সারিন্দা বা বেহালা, বাঁশি এবং খমকের সংমিশ্রণে সুরের যে আবহ তৈরি হয়, তা গানের বিষাদময় পরিবেশকে আরও গভীর করে তোলে। বিশেষ করে বাঁশির উদাসী সুর গানের বিরহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
স্রষ্টা পরিচিতি ও দেওয়ান ঐতিহ্য
- আক্কাস দেওয়ান: বৃহত্তর ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলের সুপ্রসিদ্ধ বাউল সাধক ও দেওয়ানী ধারার এক বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার। তাঁর রচিত অসংখ্য আধ্যাত্মিক, দেহতত্ত্ব ও বিচ্ছেদ গান গ্রাম-বাংলার বাউল আসরগুলোতে নিয়মিত পরিবেশিত হয়।
- দেওয়ানী সংগীত ঘরানা: বাংলার বাউল সংস্কৃতির ভেতরে দেওয়ানী ধারা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী। ভাব, দেহতত্ত্ব ও বিচ্ছেদের সংমিশ্রণে রচিত এসব গান শ্রোতাদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক অনুভূতির গভীরে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- আক্কাস দেওয়ানের নির্বাচিত বাউল ও বিচ্ছেদ গীতি সংকলন।
- বাংলার লোকসংগীত ও দেওয়ানী গানের ঐতিহ্য সমীক্ষা, ফোকলোর বিভাগ।
- বাংলাদেশ বেতার ও লোকগীতি সংগ্রহশালা আর্কাইভ।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।











![তত্ত্ব আমি একটা জিন্দা লাশ কাটিস না রে [ Ami Akta Jinda Lash Katis Na Re ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/01/আমি-একটা-জিন্দা-লাশ-1024x576.webp)

