সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৫২ পিএম

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন ও পর্যটনের বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী মাশা ইসলাম। জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলের ভ্রমণভিত্তিক আয়োজন ডিডব্লিউ ট্রাভেলে তাঁর উপস্থিতির একটি দুই মিনিট ২২ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
গত বৃহস্পতিবার ডিডব্লিউ ট্রাভেলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় ভিডিওটির সংক্ষিপ্ত অংশ প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে মাশাকে জার্মান সাংবাদিক ও উপস্থাপক এমা ক্রেমারের সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে এবং বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভ্রমণ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। প্রকাশের পরপরই ভিডিওটি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাশার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনা, সাবলীল কথাবার্তা এবং দেশের পরিচিত স্থানগুলোকে সহজ ভঙ্গিতে তুলে ধরার ধরন প্রশংসা পেয়েছে।
তবে দুই মিনিট ২২ সেকেন্ডের ভিডিওটি ছিল মূল আয়োজনের পূর্ণাঙ্গ পর্ব নয়, বরং একটি টিজার। মাশার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশজুড়ে একটি ভ্রমণভিত্তিক সিরিজ নির্মাণ ও উপস্থাপনার জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেই সূত্রেই তিনি এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। সিরিজটিতে উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে সেখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাপনের নানা দিক তুলে ধরেছেন তিনি।
মাশার সঙ্গে এই আয়োজনে ছিলেন এমা ক্রেমার। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় পরিচয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে সিরিজটিতে মোট ১০টি পৃথক গল্প রাখা হয়েছে। মাশা বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই উপস্থাপনা করেছেন। ফলে দেশের দর্শকদের কাছে বিষয়গুলো সহজবোধ্য রাখার পাশাপাশি বিদেশি দর্শকদের জন্যও বাংলাদেশের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই আয়োজনের জন্য শুধু রাজধানী নয়, দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় গেছেন মাশা ও তাঁর সহকর্মীরা। ঢাকায় তাঁরা ঘুরেছেন আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থানে। রাজধানীর বাইরে গেছেন সিলেট শহর, শ্রীমঙ্গল ও কক্সবাজারে। বাংলাদেশের পর্যটনচিত্র যে শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় স্থাপনা বা সমুদ্রসৈকতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে ইতিহাস, প্রকৃতি, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনও গভীরভাবে যুক্ত—সেই বৈচিত্র্যই গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
মাশার জন্য কাজটি ছিল ব্যক্তিগত আগ্রহ ও পেশাগত দায়িত্বের এক ধরনের মিলন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর ছবি এবং বিভিন্ন পরিবেশে গান পরিবেশনের ভিডিওও তাঁর দর্শকদের নজর কেড়েছে। এবার সেই ভ্রমণপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে নিজের দেশের গল্প আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মাশার অনুভূতিও ছিল বেশ ইতিবাচক। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি কাজ নয়, বরং জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে নতুন জায়গা দেখা, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সেগুলো ক্যামেরার সামনে তুলে ধরা তাঁর জন্য ছিল রোমাঞ্চকর।
মাশার পরিচিতির শুরু অবশ্য ভিন্ন পথে। ২০১৫ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গানের কাভার পরিবেশন করে পরিচিতি পেতে শুরু করেন তিনি। ইউটিউব ও ফেসবুকে তাঁর পরিবেশনা ধীরে ধীরে বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। একসময় সংগীতাঙ্গনের পেশাদারদের নজরেও আসেন তিনি। এরপর নিয়মিত প্লেব্যাকের সুযোগ পান এবং পেশাদার সংগীতচর্চায় আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী সময়ে ‘টেকা পাখি’, ‘একটুখানি মন’ ও ‘যেতে যেতে’সহ তাঁর কয়েকটি গান শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিতি তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কাজ প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে তাঁকে সংগীতের পেশাদার অঙ্গনে নিয়ে যায়।
নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে মাশার দৃষ্টিভঙ্গিও বেশ সরল। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ না করে নিজের ভালো লাগার জায়গা থেকে কাজ করে যাওয়াকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভালোবাসা ও আগ্রহ নিয়ে কাজ করার ফলেই সুযোগগুলো একে একে সামনে এসেছে।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইছেন মাশা। চলতি বছরের পবিত্র ঈদুল ফিতরে তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক হয়েছে তাঁর। প্রথম কাজের পর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে। ভালো গল্প ও চরিত্র পেলে ভবিষ্যতে এই মাধ্যমেও নিয়মিত কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
ভ্রমণভিত্তিক কাজ নিয়েও রয়েছে মাশার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ভ্রমণভিত্তিক ভিডিও শুরু করার ইচ্ছা থাকলেও নানা ব্যস্ততায় এখনো তা সম্ভব হয়নি। তবে কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে হয় বলে সেই অভিজ্ঞতাগুলো দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ রয়েছে তাঁর।
বর্তমানে নিজের মৌলিক গানের অ্যালবাম নিয়েও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মাশা। অ্যালবামের গানগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে দুটি গান সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েছে। ফলে সামনে তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গান দিয়ে যে পরিচিতি তৈরি করেছিলেন, অভিনয়ে যার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, এবার আন্তর্জাতিক ভ্রমণভিত্তিক আয়োজনে বাংলাদেশের গল্প বলার সুযোগ সেই যাত্রায় যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। একজন শিল্পী হিসেবে নিজের প্রতিভা প্রকাশের পাশাপাশি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের গল্প তুলে ধরার এই অভিজ্ঞতা মাশার ক্যারিয়ারে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকছে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য