সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুন ২০২৬, ৩:৫১ পিএম

ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত জগতের এক অবিসংবাদিত ও চিরস্মরণীয় নক্ষত্র হলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। বাংলা, হিন্দিসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় কণ্ঠ দিয়ে এবং বহু চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে তিনি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। এই উপমহাদেশের খুব কম মানুষই আছেন, যিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম শোনেননি অথবা তাঁর জাদুকরী কণ্ঠের গান উপভোগ করেননি। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই মহান শিল্পী অনন্য ও অকৃত্রিম বন্ধুর ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা বাঙালি জাতি চিরকাল পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
Table of Contents
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের গান অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষকে গভীরভাবে উজ্জীবিত করেছিল এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জুগিয়েছিল অদম্য অনুপ্রেরণা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর কালজয়ী গান:
“মা গো, ভাবনা কেন?
আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে,
তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি…”
এই গানটি বাঙালির জাতীয় জীবনে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। শুধু বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়ার মধ্যেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবদান সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ভারতের অন্যান্য প্রথিতযশা শিল্পীদের সাথে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির এবং চ্যারিটি অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে গান গেয়েছেন। এসব অনুষ্ঠান ও গান গাওয়ার মাধ্যমে তিনি যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তা বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ শরণার্থীর মানবিক সহায়তার জন্য গঠিত তহবিলে তুলে দিয়েছিলেন।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সংগীতের সকল শাখায় সমানভাবে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া “হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা” কিংবা বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় গান “এই পথ যদি না শেষ হয়”— এই ধরনের সৃষ্টিগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। রোমান্টিক এবং আধুনিক গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীতেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়। তাঁর গম্ভীর ও দরদি কণ্ঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানগুলো এক অনন্য ও জীবন্ত রূপ লাভ করত, যা রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল।
সংগীতের প্রতি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নিবেদন ছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক চিন্তা ও মোহের ঊর্ধ্বে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে যখন তিনি ভারত সরকারের দেওয়া অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ এবং ‘পদ্মভূষণ’ উভয় পদকই বিনম্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে তিনি দুইবার ভারতের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। নিচে তাঁর জীবন ও কীর্তির মূল তথ্যাদি একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ও দিকসমূহ | বিস্তারিত তথ্য, বিবরণ ও ঐতিহাসিক ফ্যাক্টস |
| নাম | হেমন্ত মুখোপাধ্যায় |
| জন্ম তারিখ | ১৬ জুন, ১৯২০ সাল |
| পেশাগত পরিচয় | সংগীতশিল্পী, সুরকার এবং চলচ্চিত্র সংগীত পরিচালক |
| গাওয়া ভাষার পরিধি | বাংলা, হিন্দিসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষা |
| মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গেয়ে অনুপ্রেরণা প্রদান এবং অর্থ সংগ্রহ |
| বিখ্যাত সৃষ্টিসমূহ | “মা গো, ভাবনা কেন?”, “এই পথ যদি না শেষ হয়”, “হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা” |
| প্রত্যাখ্যাত সম্মাননা | ভারতের বেসামরিক পদক ‘পদ্মশ্রী’ এবং ‘পদ্মভূষণ’ |
| প্রধান রাষ্ট্রীয় অর্জন | দুইবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ |
১৯২০ সালের ১৬ জুন জন্মগ্রহণ করা সুরের ভুবনের এই উজ্জ্বল শুকতারা তাঁর কাজের মাধ্যমে নিজেকে অমর করে রেখেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিম অবদান বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সংগীতের মাধ্যমে মানবতাকে জাগ্রত করার এবং আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা চিরকাল বিশ্বজুড়ে সংগীতপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে। এই মহান সুরের জাদুকরের প্রতি বাঙালি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চিরকাল অক্ষুণ্ন থাকবে।
মন্তব্য