সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

বাংলা গানের সুবিশাল ও সমৃদ্ধ ইতিহাসে কিছু গান কেবল সুর আর বাণীর মেলবন্ধনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি জাতির ইতিহাস, সংগ্রাম, চেতনা এবং আত্মপরিচয়ের অবিনাশী স্মারক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—বাঙালির প্রতিটি জাতীয় সংকটে ও বিজয়ের গৌরবে যেসব গান কোটি মানুষকে আলোড়িত করেছে, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গান “সালাম সালাম হাজার সালাম”। ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত এই কালজয়ী গানের রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত গীতিকার, কবি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজল-এ-খোদা। বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁর এই কালজয়ী অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
Table of Contents
ফজল-এ-खोদা ১৯৪২ সালের ৯ মার্চ পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার বনগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যের প্রতি এক গভীর অনুরাগ ও সহজাত প্রতিভা লক্ষ্য করা যায়। এই সৃষ্টিশীল মননই তাঁকে পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যময় ভুবনে নিয়ে আসে। তিনি কেবল একজন প্রথিতযশা গীতিকারই ছিলেন না; একাধারে কবি, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, প্রথাবিরোধী সম্পাদক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও তিনি মাতৃভূমির সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা গানের ভাণ্ডারকে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মহান শহীদদের স্মরণে ফজল-এ-খোদা রচনা করেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি “সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে”। এই গানটির পেছনে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। গানটিতে সুরারোপ করেন প্রখ্যাত সুরকার আব্দুল লতিফ এবং ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা) থেকে কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারের দরাজ কণ্ঠে এটি প্রথম প্রচারিত হয়।
৭১-এর উত্তাল দিনগুলোতে এই গানটি অবরুদ্ধ বাংলাদেশে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করা সাধারণ মানুষ এবং রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে এক নতুন উদ্দীপনা ও সাহসের সঞ্চার করেছিল। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আজও এই গানের প্রতিটি পঙ্ক্তি বাঙালির মনে সমানভাবে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পরবর্তীতে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় এই গানটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান লাভ করে।
শুধু এই একটি গানই নয়, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে যখন চারদিকে বারুদের গন্ধ, তখন টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর লেখা আরেকটি বিখ্যাত গণসংগীত “সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম—চলবে দিনরাত অবিরাম” বাঙালির মুক্তিকামী চেতনাকে আরও শাণিত ও বেগবান করেছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়, যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেই সময় ফজল-এ-খোদা বাংলাদেশ বেতারে অত্যন্ত দায়িত্বশীল পদে কর্মরত ছিলেন। চারদিকে যখন সামরিক জান্তার ভয়, নীরবতা, শোক আর চরম অনিশ্চয়তা, তখন একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের জীবনের পরোয়া না করে কাব্যের ভাষায় এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি লিখেছিলেন—
“ভাবনা আমার আহত পাখির মতো পথের ধুলায় লুটোবে,
সাত রঙে রাঙা স্বপ্নবিহঙ্গ সহসা পাখনা গুটোবে—
এমন তো কথা ছিল না।”
এই অবিস্মরণীয় ও সাহসী গানটির সুর করেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী বশীর আহমেদ এবং তাঁরই কণ্ঠে গীত এই বেদনাভরা প্রতিবাদী গানটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হিসেবে টিকে রয়েছে।
স্বাধীনতার পর ফজল-এ-খোদা সমান তালে তাঁর সৃজনশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে গেছেন। আধুনিক গান, দেশাত্মবোধক গান, লোকসংগীত, ভক্তিমূলক গান ও চলচ্চিত্রের গানে তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। চিত্রপরিচালক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) পরিচালিত “এপার ওপার” চলচ্চিত্রে তাঁর লেখা “ভালোবাসার মূল্য কত, আমি কিছু জানি না” গানটি আশির দশকে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং আজও তা শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়।
বেতার ও টেলিভিশনের বহু দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, লিখন ও নির্দেশনার নেপথ্যে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ বেতারের নিজস্ব মুখপত্র “বেতার বাংলা”-এর প্রথম সম্পাদক হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, শিশুদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জনপ্রিয় শিশু-কিশোর সংগঠন “শাপলা শালুক”।
পারিবারিক জীবনে ফজল-এ-খোদার সহধর্মিণী ছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা মাহমুদা সুলতানা। এই দম্পতির কোল আলো করে আসেন তিন পুত্র—ওয়াসিফ-এ-খোদা, ওনাসিস-এ-খোদা এবং ওয়েসিস-এ-খোদা, যাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
বাংলা ভাষা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, প্রগাঢ় দেশপ্রেম এবং মানবিক চেতনাকে গানের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালে এই মহান ব্যক্তিত্বকে মরণোত্তর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা “একুশে পদক”-এ ভূষিত করে।
২০২১ সালের ৪ জুলাই বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সময়ে এই কালজয়ী শব্দসৈনিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জাগতিকভাবে তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পীর কখনো মৃত্যু হয় না। ফজল-এ-খোদা চিরকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর অমর সৃষ্টির মাঝে, বাঙালির জাতীয় চেতনায় এবং কোটি শ্রোতার অন্তহীন ভালোবাসায়।
মন্তব্য