সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৪:২৭ পিএম

চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে একসময় সুরের জাদু ছড়িয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ। কণ্ঠের মাধুর্য দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করা সেই চেনা মুখের মুগ্ধ এবার সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয়ে আলোচনায় এসেছেন। ৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে প্রশাসন ক্যাডারে সাধারণ মেধার ভিত্তিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। দেশজুড়ে তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই সরকারি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় প্রথম ৫০ জনের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ স্থান করে নিয়েছেন এই প্রতিভাবান তরুণ। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদানের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করলেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্টের মাধ্যমে জীবনের এই অবিস্মরণীয় সুখবরটি ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানান মুগ্ধ। তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। ৪৭তম বিসিএস। প্রশাসন ক্যাডার। মেধাক্রমে দেশের প্রথম ৫০-এ স্থান করে নিয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশপ্রাপ্তির সুসংবাদ জানাই সবাইকে।’
একই পোস্টে এই অভাবনীয় অর্জনের পেছনের দীর্ঘ ও প্রতিকূল পথচলার কথাও আবেগঘনভাবে উল্লেখ করেন তিনি। ২০১৯ সাল থেকে ঢাকার একটি সুপরিচিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত মুগ্ধ আরও লেখেন, ‘শত দায়িত্বের চাপ, সহস্র সংশয়, দোটানা। তারপরও অজস্র প্রশ্নোত্তরের খোঁজে ৪৭, সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বান্দার শ্রমের প্রতিদান যিনি দিয়েছেন, সেই মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে লাখোকোটি শুকরিয়া।’ শিক্ষকতা পেশার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে মুগ্ধ জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় আমাকে যে আত্মতৃপ্তি দিয়েছে, বিসিএসের এই সাফল্যের আনন্দের মধ্যেও সেই অনুভূতির মূল্য বিন্দুমাত্র কমে যায়নি।’
মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধর সাফল্যের গল্প অবশ্য আজকের নয়; শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন। এরপর ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) এবং ঢাকার স্বনামধন্য নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে (এইচএসসি) জিপিএ–৫ পান। পরবর্তীতে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ‘বুয়েট’ থেকে প্রকৌশল শিক্ষায় স্নাতক সম্পন্ন করে নিজের মেধার অনন্য স্বাক্ষর রাখেন।
গানের পাশাপাশি গণিত ও বিজ্ঞানের জগতেও সমান উজ্জ্বল ছিলেন মুগ্ধ। ২০১২ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ৫৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (IMO) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ‘অনারেবল মেনশন’ অর্জন করেন। এছাড়া জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে টানা ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
২০১০ সালে চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন মুগ্ধ। তবে কেবল সংগীতেই নয়, উপস্থিত বক্তৃতা, সৃজনশীল রচনা লিখন, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন তিনি। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার আগেই তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছিল ২৯টি জাতীয় পুরস্কার। পড়াশোনা ও সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে খেলাধুলাতেও ছিলেন সমান সফল; ২০০৮ সালে আন্তস্কুল টেবিল টেনিস ও বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
ময়মনসিংহের চড়পাড়ায় জন্ম নেওয়া মুগ্ধর পারিবারিক জীবনও শিক্ষার আলোয় আলোকিত। তাঁর বাবা ইসকান্দর মির্জা একজন কলেজশিক্ষক এবং মা তাহমিনা বেগম স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়; পারিবারিক সূত্রে তাঁর একটি যমজ ভাইও রয়েছেন। গান, গণিত, উচ্চশিক্ষা কিংবা সৃজনশীল নেতৃত্ব—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেওয়া মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধর পথচলা এবার দেশের মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে। প্রজাতন্ত্রের নতুন দায়িত্বে সততা, দেশপ্রেম ও সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার অঙ্গীকার নিয়ে জীবনের এক নতুন গৌরবময় অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন এই তরুণ কর্মকর্তা।
মন্তব্য