বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের লোকজ ঐতিহ্য ও বিলুপ্তপ্রায় আঞ্চলিক শব্দসমূহকে গানের মাধ্যমে ধরে রাখার অন্যতম কারিগর, বিশিষ্ট গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী অনিল হাজারিকা বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নিজ বাসভবনে অত্যন্ত অসহায় দিনাতিপাত করছেন। সত্তর বছর বয়সী এই গুণী শিল্পী দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ মারাত্মক হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। চরম আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এক সময়ের তুমুল ব্যস্ত ও জনপ্রিয় এই শিল্পী এখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর গান গাইতে বা নতুন কোনো গান সৃষ্টি করতে পারছেন না, যা তাঁকে মানসিকভাবেও ব্যাপক বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
অনিল হাজারিকা মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নের শতখালি বা তিলখড়ি গ্রামের প্রয়াত হাজারী লাল বিশ্বাসের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁরা তিন ভাই ও দুই বোন। অন্য দুই ভাই পৈতৃক গ্রামেই বসবাস করেন এবং বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। অনিল হাজারিকা বর্তমানে তাঁর স্ত্রীর সাথে পৈতৃক ভিটায় একটি সাধারণ টিনের চালার ঘরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁর দুই কন্যাসন্তানের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে সংসারে কেবল তিনি ও তাঁর স্ত্রী জ্যোৎস্না হাজারিকা রয়েছেন।
সংগীত জীবন ও লোকসংস্কৃতিতে অবদান
অনিল হাজারিকার গানের হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর প্রয়াত পিতা হাজারী লাল বিশ্বাসের মাধ্যমে, যিনি নিজেও একজন স্থানীয় লোকসংগীত শিল্পী ছিলেন। চরম দারিদ্র্যের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ত্যাগ করে অনিল হাজারিকাকে তাঁর বাবার সাথে জীবনসংগ্রামের কাজে নেমে পড়তে হয়। পরবর্তীতে মাত্র ২০ বছর বয়স থেকে তিনি নিয়মিত গান লেখা এবং সুর করার কাজ শুরু করেন। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের লোকজ ভাষা ও লব্জ তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করায় তিনি এই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাকে কেন্দ্র করে গান রচনা শুরু করেন।
দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি প্রায় ১ হাজার ৩০০টি আঞ্চলিক গান রচনা, সুরারোপ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন, যা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষণের অভাবে তাঁর বহু গান ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। ১৯৮৫ সালে তিনি খুলনা বেতারের একজন তালিকাভুক্ত নিয়মিত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তাঁর গানগুলো বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রচারিত হয়েছে।
শিল্পীর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত ও স্বীকৃতি
নিচে সারণির মাধ্যমে বিশিষ্ট এই আঞ্চলিক লোকসংগীত শিল্পীর জীবন, পারিবারিক পটভূমি, অবদান ও বর্তমান পরিস্থিতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| নির্দিষ্ট বিষয়সমূহ | গুণী শিল্পীর বিস্তারিত তথ্য বিবরণী |
| নাম ও বর্তমান বয়স | অনিল হাজারিকা, বয়স ৭০ বছর। |
| পারিবারিক পরিচয় | পিতা: প্রয়াত হাজারী লাল বিশ্বাস (তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ)। |
| স্থায়ী বাসস্থান | তিলখড়ি গ্রাম, ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়ন, শালিখা উপজেলা, মাগুরা। |
| গানের সংখ্যা ও স্বীকৃতি | প্রায় ১,৩০০টি আঞ্চলিক গান (১৯৮৫ সালে খুলনা বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী)। |
| প্রাপ্ত প্রধান সম্মাননা | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগ, যশোরের নৃত্যবিতান এবং মাগুরা শিল্পকলা একাডেমি। |
| বর্তমান শারীরিক অবস্থা | দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ মারাত্মক হৃদ্রোগে আক্রান্ত ও চিকিৎসাবঞ্চিত। |
উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তার আকুতি
শিল্পীর স্ত্রী জ্যোৎস্না হাজারিকা জানান যে, পাঁচ বছর আগে তাঁর স্বামীর হৃদ্রোগ ধরা পড়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতিমধ্যে ৪ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়ে গেছে। পৈতৃক শেষ সম্বল ব্যয় করেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। বর্তমানে টাকার অভাবে চিকিৎসা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে তিনি পুনরায় সুস্থ হয়ে গান লেখা এবং সুর করার কাজে স্বাভাবিকভাবে ফিরে যেতে পারবেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনিল হাজারিকার এই অনবদ্য অবদানের জন্য তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বা ফোকলোর বিভাগ, যশোরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যবিতান’ এবং মাগুরা জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেছেন। এই লোকশিল্পী আশা প্রকাশ করেছেন যে, সরকার তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি আবারও সংগীতের ভুবনে ফিরতে পারবেন।
এই প্রসঙ্গে শালিখা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জানান যে, অনিল হাজারিকা যদি চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতার আবেদন জানিয়ে জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আবেদনপত্র জমা দেন, তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
