সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই অক্টোবর ২০২২, ৩:৩৪ পিএম

নব্বইয়ের দশকের শেষ কিংবা শূন্য দশকের শুরুর দিকের কথা। ঢাকাইয়া নাগরিক ব্যান্ড সঙ্গীতের চেনা রক-মেটাল ঘরানার ভিড়ে হঠাৎ করেই এক ঝাঁক তরুণ চুলে জট বেঁধে, হাতে একতারা-দোতারা নিয়ে মঞ্চে এসে দাঁড়াল। ড্রামস আর ইলেকট্রিক গিটারের তীব্র রিদমের সাথে যখন এক মায়াবী, উদাসী আর মাটির গন্ধমাখা কণ্ঠ গেয়ে উঠল—“তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা…”—ঠিক তখনই বাংলা ফোক-রক সঙ্গীতের ইতিহাসে এক নতুন বিপ্লব ঘটে গেল।
সেই বিপ্লবের নাম—‘বাংলা’ ব্যান্ড। আর সেই জাদুকরী, ক্ষমতাশালী কণ্ঠের অধিকারীর নাম—আনুশেহ আনাদিল। তিনি কেবল একজন সঙ্গীতশিল্পী নন; তিনি একাধারে সংস্কৃতিকর্মী, উদ্যোক্তা এবং নিজের শর্তে জীবন বাঁচা এক খাঁটি জীবনশিল্পী।

Table of Contents
আনুশেহের সঙ্গীতের হাতেখড়ি কিন্তু মাটির গানে নয়, হয়েছিল একেবারে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠিন ব্যাকরণে। তিনি প্রখ্যাত ওস্তাদ সগীরুদ্দীন খানের অধীনে উত্তর ভারতীয় ক্লাসিকাল সঙ্গীতের কঠোর তালিম নেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দীক্ষা নেন গুণী শিল্পী কল্পনা দত্তের কাছেও।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এই মজবুত ভিত্তি নিয়েই ১৯৯৮ সালে তিনি যুক্ত হন ‘বাংলা’ ব্যান্ডের সাথে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই গম্ভীর গায়কিকে যখন তিনি বাংলার লোকসঙ্গীত, বাউল গান আর লালনের দর্শনের সাথে মিশিয়ে দিলেন, তখন তৈরি হলো এক অভূতপূর্ব সুরের রসায়ন। লালন সাঁইজির দর্শনকে তিনি নতুন প্রজন্মের শহুরে তরুণদের কান ও মগজে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিলেন, যা এর আগে কেউ ভাবেনি।
আনুশেহের কণ্ঠের এই আদিম, অকৃত্রিম শক্তি শুধু দেশের মাটিতেই আটকে থাকেনি, তা সীমানা ছাড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশ থেকে নানা সম্মাননা এসেছে তার ঝুলিতে:
আনুশেহ শুধু মুখে সংস্কৃতির কথা বলেননি, তা নিজের জীবনে যাপন করেছেন। দেশীয় ঐতিহ্য, খাদি কাপড় আর লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি গড়ে তোলেন ভিন্নধর্মী জীবনশৈলী ব্র্যান্ড “যাত্রা” (Jatra- A Journey Into Craft)। ঢাকাকেন্দ্রিক এই বুটিক ও কারুশিল্পের দোকানে আজ কাজ করছেন শত শত প্রান্তিক গ্রামীণ কারুশিল্পী। প্লাস্টিক আর কৃত্রিমতার ভিড়ে ‘যাত্রা’ আমাদের শেখায় কীভাবে মাটির কাছাকাছি থেকে স্টাইলিশ হওয়া যায়।
আনুশেহর ব্যক্তিগত জীবনটাও কোনো চেনা ছকে বাঁধা নয়। তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ‘বাংলা’ ব্যান্ডেরই আরেক প্রতিভাবান সদস্য ও সঙ্গীত পরিচালক বুনোকে। দুই সন্তান—আরাশ ও রাহাকে নিয়ে তাদের সংসার দারুণ কাটলেও, এক সময় জীবনের টানেই তারা আলাদা হয়ে যান। বিচ্ছেদের পর দুই সন্তানকে একাই আগলে রেখেছিলেন আনুশেহ।
এর দীর্ঘ সাত বছর পর, ২০১৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তিনি এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন। জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন আমেরিকান বংশোদ্ভূত গিটারিস্ট ও গায়ক সেথ পান্ডুরাঙা ব্লুমবার্গ (পান্ডু)-কে। এই মিউজিশিয়ান দম্পতি ঢাকাতেই গড়ে তুলেছেন ‘যাত্রা বিরতি’ নামের এক দারুণ মিউজিক্যাল ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ, যেখানে নাগরিক কোলাহলের মাঝে বাউল, সুফি আর ফোক গানের আসর বসে। পাশাপাশি দুজনে মিলে তৈরি করেছেন নতুন ব্যান্ড ‘বাহক’।
আনুশেহ আনাদিল মানেই একবিংশ শতাব্দীর এক স্বাধীনচেতা বাউলানী। যিনি পশ্চিমা গিটার কিংবা ড্রামসের বিটেও যেমন একতারার টান দিতে পারেন, তেমনি সমাজের বেঁধে দেওয়া চেনা নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের জীবনটাকে একটা সুরের নদী বানিয়ে বইয়ে দিতে পারেন।
মন্তব্য