বাংলাদেশের অডিও শিল্প ও চলচ্চিত্রের নেপথ্য সংগীতে (প্লেব্যাক) খালিদ হাসান মিলু এক উজ্জ্বল ও মেলোডিয়াস নাম। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর কণ্ঠের সহজাত দরদ, আবেগ এবং কোমল সুরের জাদু কোটি শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করেছিল। বিরহ, প্রেম ও বিচ্ছেদের গানে তাঁর বিশেষ গায়কি বাংলা মেলোডি গানকে দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র মাত্রা।

Table of Contents
সংক্ষিপ্ত তথ্যসারণি
| তথ্যসূত্র | বিবরণ |
| পূর্ণ নাম | খালিদ হাসান মিলু |
| জন্ম | ৬ এপ্রিল, ১৯৬০ |
| জন্মস্থান | আদর্শপাড়া গ্রাম, পিরোজপুর জেলা, বরিশাল বিভাগ |
| পিতার নাম | মোদাসের আলী মিয়া |
| দাম্পত্য সঙ্গিনী | ফাতিমা হাসান পলাশ (বিবাহ: ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬) |
| সন্তান | প্রতীক হাসান ও প্রীতম হাসান |
| সংগীতের ধরন | মেলোডি, আধুনিক বাংলা গান, পপ, প্লেব্যাক ও লোকগীতি |
| প্রথম একক অ্যালবাম | ওগো প্রিয় বান্ধবী (১৯৮০) |
| জাতীয় পুরস্কার | শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী (জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৯৯৪) |
| মৃত্যু | ২৯ মার্চ, ২০০৫ (বয়স ৪৪ বছর) |
| সমাধিস্থল | মিরপুর কবরস্থান (মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান), ঢাকা |
প্রারম্ভিক জীবন ও সংগীতচর্চার সূচনা
খালিদ হাসান মিলু ১৯৬০ সালের ৬ এপ্রিল পিরোজপুর জেলার আদর্শপাড়া গ্রামে এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
তাঁর বাবা মোদাসের আলী মিয়ার হারমোনিয়ামের সুরের মধ্য দিয়েই ছোটবেলায় মিলুর সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মায়। পরবর্তীতে খুলনায় থাকাকালীন ওস্তাদ রবিন দাস, সুরেশ দাসসহ কয়েকজন গুণী শিল্পীর কাছে সংগীতে আনুষ্ঠানিক পাঠ গ্রহণ করেন। সংগীতাঙ্গনে প্রবেশের গোড়ার দিকে খুলনায় তিনি ‘স্পার্টান’ নামে একটি ব্যান্ড দল গঠন করেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে পেশাদার অডিও সংগীতে পা রাখতে অনুপ্রাণিত করে।
সংগীতজীবন ও অডিও অ্যালবামের সফলতা
১৯৮০ সালের প্রথমার্ধে খালিদ হাসান মিলু একক অ্যালবাম দিয়ে অডিও জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘ওগো প্রিয় বান্ধবী’। অ্যালবামের গানগুলো সাড়া ফেলায় তিনি দ্রুত সংগীতাঙ্গনে নিজের স্থান সুদৃঢ় করেন।
সুদীর্ঘ সংগীতজীবনে তাঁর মোট ১২টি একক অ্যালবাম এবং প্রায় ১২০টিরও বেশি দ্বৈত ও মিশ্র (মিক্সড) অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। অডিও ক্যাসেটের সোনালী যুগে তৎকালীন জনপ্রিয় অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সাউন্ডটেক, অনুপম, সংগীতা ও সারগাম থেকে তাঁর একাধিক হিট অ্যালবাম বাজারে আসে।
উল্লেখযোগ্য একক অ্যালবামসমূহ:
- ওগো প্রিয় বান্ধবী (১৯৮০)
- আহত হৃদয়
- নীলা
- শেষ ভালোবাসা
- মানুষ
- অচিন পাখী
- আমি একা বড় একা
- শেষ খেয়া
- মিষ্টি জোৎস্না
- আয়না
- প্রতিশোধ নিও
চলচ্চিত্রে নেপথ্য গায়ন (প্লেব্যাক) ও জাতীয় সম্মাননা
১৯৮২-৮৩ সালের দিকে চলচ্চিত্রে নেপথ্য গায়ক হিসেবে খালিদ হাসান মিলুর যাত্রা শুরু হয়। ‘কালো গোলাপ’ এবং ‘প্রিন্সেস টিনা খান’ চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে নিয়মিত প্লেব্যাক শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রায় ২৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। অডিও ও চলচ্চিত্র মিলিয়ে তিনি হাজার হাজার গানের রেকর্ড সম্পন্ন করেন।
নব্বইয়ের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক ও আবেগঘেঁষা গানগুলোতে তাঁর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি:
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান “ভালোবাসা ভালোবাসা মানে না কোনো পরাজয়” গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া তিনি বাচসাস (BACSA) পুরস্কার সহ বেশ কিছু সম্মাননায় ভূষিত হন।
জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানসমূহ
খালিদ হাসান মিলুর কন্ঠে ধারণ করা বহু গান শ্রোতামহলে সমাদৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু জনপ্রিয় গান:
বিখ্যাত অডিও ও চলচ্চিত্রের গান:
- অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন
- যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়
- সেই মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে কিনা
- কতদিন দেহি না মায়ের মুখ
- নিশিতে যাইয়ো ফুলবনে
- নীলা তুমি আবার এসো ফিরে
- প্রতিশোধ নিও অভিশাপ দিও
- আহত হৃদয় ছুটে আসি
- সজনী আমিতো তোমায় ভুলিনি
- ও ভুবন মাঝি আমায় তুমি পার করে দাও
- তুমি আমার হৃদয়ে যদি থাকো
- পৃথিবীকে ভালোবেসে সুরে সুরে কাছে এসে
- শোনো শোনো ও প্রিয়া প্রিয়া গো
- যে নদী মরু পথে পথটি হারাল
- যতদূরে যাও মনে রেখো
- যদি পারো ভালোবেসে এসো
- হাসলে তোমার মুখ হাসে না
- কে বলে সালাম নেই
ইত্যাদি বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ছেলে প্রতীক হাসানের সঙ্গে তাঁর গাওয়া “জীবনের এই আনন্দময় দিন” গানটি ছিল জীবনের শেষ ধারণকৃত গান।

ব্যক্তিগত জীবন ও সংগীতের উত্তরাধিকার
খালিদ হাসান মিলু ১৯৮৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ফাতিমা হাসান পলাশের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির দুই সন্তান—প্রতীক হাসান এবং প্রীতম হাসান।
জীবদ্দশায় তিনি ছেলেদের লেখাপড়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে গান শেখাননি। তবে সুরের ধারায় দুই ছেলেই বর্তমানে বাংলাদেশের আধুনিক সংগীত, অভিনয় ও সুরসংযোজনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। বড় ছেলে প্রতীক হাসান একজন সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী এবং ছোট ছেলে প্রীতম হাসান গায়ক, সুরকার, প্রডিউসার ও অভিনেতা।
অসুস্থতা ও জীবনাবসান
২০০০ সাল থেকে খালিদ হাসান মিলু শারীরিক নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ২০০১ সালে তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (Brain Hemorrhage)জনিত জটিলতায় আক্রান্ত হন, যার ফলে তাঁর স্মৃতিশক্তিতে কিছুটা প্রভাব পড়ে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি লিভার সিরোসিস রোগেও আক্রান্ত হন।
অসুস্থতার সাথে লড়াই করার পর ২০০৫ সালের ২৯ মার্চ রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকার মনোয়ারা হাসপাতালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে বর্ষীয়ান এই কণ্ঠশিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে (মিরপুর কবরস্থান) তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তথ্যসূত্র ও সহায়কের তালিকা
বাংলা সঙ্গীতের কালজয়ী ব্যক্তিত্ব, গানের পেছনের না-বলা গল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে আকর্ষণীয় আখ্যানে উপস্থাপন করতে কাজ করছে ‘ফিচার ডেস্ক’। এখানে স্থান পায় প্রখ্যাত শিল্পী ও সুরকারদের জীবনভিত্তিক বিবরণী, সৃষ্টিশীল কাজের নেপথ্য ইতিহাস এবং সুরের বিবর্তনের তথ্যভিত্তিক রূপলেখ। গভীর পর্যবেক্ষণ ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণের সমন্বয়ে সঙ্গীতকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আবিষ্কার করাই আমাদের লক্ষ্য।








![ও পলাশ ও শিমুল [ O Polash O Shimul ] 5 ও পলাশ ও শিমুল ও পলাশ ও শিমুল [ O Polash O Shimul ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/ও-পলাশ-ও-শিমুল-1024x576.webp)






