তোমাকে আমার মনে চায় [ Tomake Aamar Mone Chay ] মুজিব পরদেশী

বাংলা লোকসংগীত ও বিরহধারার সংগীতে প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মুজিব পরদেশীর একটি আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী গান “তোমাকে আমার মনে চায়”। গানটির কথা, সুর ও কণ্ঠ—তিনটি মাধ্যমেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তা। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর বেদনা, অবহেলার বিপরীতে তীব্র অনুযোগ এবং শয়নে-স্বপনে কেবল প্রিয়জনের সান্নিধ্য কামনার চিরন্তন আকুলতা গানটিতে অত্যন্ত সহজ-সরল ও মর্মস্পর্শী লোকজ সুরে রূপায়িত হয়েছে। আশির দশকে অডিও মাধ্যমে প্রকাশের পর গানটি সাধারণ শ্রোতাদের মাঝে বিপুল সমাদর লাভ করে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামতোমাকে আমার মনে চায়
গীতিকার ও সুরকারমুজিব পরদেশী
মূল কণ্ঠশিল্পীমুজিব পরদেশী
সংগীতধারালোকসংগীত / বিরহ ও বিচ্ছেদ গান
মূল উপজীব্যপ্রেমাস্পদের সান্নিধ্যের আকুতি, বিরহের আর্তি ও নিঃসঙ্গতা
সুরশৈলীগ্রামীণ লোকজ সুর / ফোক মেলোডি
প্রধান অনুষঙ্গশয়নে-স্বপনে ধ্যান, পোড়া মনের বাসনা ও সমর্পণ

তোমাকে আমার মনে চায় [ Tomake Aamar Mone Chay ]

তোমাকে আমার মনে চায় রে প্রাণের বন্ধু
তোমাকে আমার মনে চায় (ও বন্ধুরে)

পিরিতি করিয়া কেন গেলা ছাড়িয়া
তোমার কি দয়া-মায়া নাই

শয়নে-স্বপনে ধ্যান জাগরনে
সব সময় তোমায় যেন পাই

পরদেশীর বেদনা পোড়া মনের বাসনা
তুমি ছাড়া আমার কেহ নাই

Tomake Amar Mone Chay [Tomake Aamar Mone Chay]

Tomake amar mone chay re praaner bondhu
Tomake amar mone chay (O bondhure)

Piriti koriya keno gela chhariya
Tomar ki doya-maya nai

Shoyone-shopone dhyan jagorone
Shob shomoy tomay jeno pai

Pordeshir bedona pora moner bashona
Tumi chhara amar keho nai

গানের মূল ভাব

“তোমাকে আমার মনে চায়” গানটির মূল ভিত্তি হলো প্রেমাস্পদের সান্নিধ্যের এক চরম ব্যাকুলতা এবং একতরফা বিরহের হাহাকার। প্রেম কেবল বাহ্যিক কোনো সম্পর্ক নয়; তা যখন আত্মার গভীরে প্রবেশ করে, তখন সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে কেবল সেই প্রিয় মানুষেরই উপস্থিতি বিরাজ করে।
গানটিতে একদিকে যেমন ছেড়ে যাওয়ার কারণে প্রিয়জনের প্রতি বিনীত অনুযোগ ও ব্যথিত অভিমান রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে নিঃশর্ত ভালোবাসার দাবি। জাগ্রত কিংবা নিদ্রিত—যেকোনো অবস্থাতেই মন কেবল প্রিয় মুখটিকেই খুঁজে ফেরে। প্রিয় মানুষ ছাড়া এই বিশাল ভুবনে যে আর কোনো আশ্রয় নেই, এই অসহায়ত্বই গানের কেন্দ্রীয় সুরকে গভীর বিষাদে আবৃত করেছে।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. মনের ব্যাকুলতা ও অনুযোগ

  • “তোমাকে আমার মনে চায় রে প্রাণের বন্ধু… / পিরিতি করিয়া কেন গেলা ছাড়িয়া তোমার কি দয়া-মায়া নাই…”
    গানটির শুরুতেই প্রেমাস্পদকে ‘প্রাণের বন্ধু’ সম্বোধন করে মনের গভীর আকুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। সম্পর্কের শুরুতে ভালোবাসা দেখিয়ে পরবর্তীতে হঠাৎ ছেড়ে চলে যাওয়ার যে নিষ্ঠুরতা, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রিয়জনের হৃদয়হীনতার প্রতি অনুযোগ তোলা হয়েছে।

২. শয়নে-স্বপনে অবিচ্ছেদ্য ধ্যান

  • “শয়নে-স্বপনে ধ্যান জাগরনে সব সময় তোমায় যেন পাই…”
    এখানে ভালোবাসার মনস্তাত্ত্বিক তীব্রতা ফুটে উঠেছে। প্রেমিকের চিন্তাভাবনা দিন-রাত্রির প্রতিটি ক্ষণে কেবল প্রিয়জনকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। বাস্তবে না পাওয়া গেলেও কল্পনা ও স্বপ্নে তাকে ধরে রাখার যে আকুতি, তা বিরহী মনের এক চিরচেনা রূপ।

৩. ভণিতা ও চূড়ান্ত অসহায়ত্ব

  • “পরদেশীর বেদনা পোড়া মনের বাসনা তুমি ছাড়া আমার কেহ নাই…”
    চিরায়ত লোকরীতির ধারা বজায় রেখে গানের ভণিতায় ‘পরদেশী’ নামটি যুক্ত করা হয়েছে। নিজের হৃদয়কে ‘পোড়া মন’ আখ্যা দিয়ে সাধক-শিল্পী স্পষ্ট করেছেন যে, এই পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ প্রেমিকের একমাত্র সান্ত্বনা ও আশ্রয় কেবল সেই প্রিয় মানুষটিই।

সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য

  • সহজ ও সরাসরি প্রকাশভঙ্গি: কোনো জটিল অলংকার বা দুর্বোধ্য দার্শনিক রূপক ছাড়াই গ্রামীণ কথ্য বুলির মাধ্যমে মনের নিখাদ কষ্ট প্রকাশ করা হয়েছে।
  • অনুপম ভণিতা: রচয়িতা নিজের নাম বা ছদ্মনাম (পরদেশী) গানের কথার সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন, যা একই সাথে গীতিকারের পরিচয় এবং একজন একাকী পথিকের বেদনার রূপক হিসেবে কাজ করে।
  • চিরায়ত লোকভাবনা: মধ্যযুগীয় পদাবলী কিংবা বাউল বিচ্ছেদের মতো এখানেও ‘পিরিতি’ ও ‘দয়া-মায়া’-র মতো চিরচেনা ভাবাবহের প্রয়োগ লক্ষণীয়।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কী

  • মুজিব পরদেশীর স্বতন্ত্র গায়নশৈলী: মুজিব পরদেশীর কণ্ঠে যে এক ধরনের তীব্র আবেগীয় টান এবং কান্নাজড়িত আর্তি রয়েছে, তা এই গানের সুরকে অসাধারণ এক গভীরতা দিয়েছে।
  • যন্ত্রসংগীতের লোকজ আবহ: দোতারা, বাঁশি এবং তবলার সহজ ও প্রবহমান ছন্দে গানটি সুরারোপিত। সুরের ধীর বিস্তার শ্রোতার মনে একাকীত্বের এক নিঃশব্দ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

শিল্পী পরিচিতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

  • মুজিব পরদেশী (মুজিবুর রহমান মোল্লা): করাচিতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী শৈশবেই শাস্ত্রীয় সংগীতে ওস্তাদ গোলাম হায়দার আলী খান ও ওস্তাদ ফজলুল হকের মতো ওস্তাদদের কাছে তালিম নেন এবং তবলায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী আবদুল আলীমের সান্নিধ্যে এসে তিনি লোকগীতির মর্মবাণী আত্মস্থ করেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শিল্পী হিসেবে অবদান রাখেন।
  • সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা: আশির দশকের অডিও ক্যাসেট বিপ্লবের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে মুজিব পরদেশীর গাওয়া বিচ্ছেদ গানগুলো তৎকালীন সময়ে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আধুনিক যুগেও তাঁর গানগুলো লোকসংগীত অনুরাগীদের কাছে পরম যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ লোকসংগীত সংগ্রহশালা, ফোকলোর ও আধুনিক লোকগান বিভাগ।
  2. মুজিব পরদেশীর অফিসিয়াল অডিও প্রকাশনা রেকর্ডস (আশির দশকের মূল ক্যাসেট অ্যালবাম)।
  3. আধুনিক বাংলা লোকসংগীতের বিবর্তন ও মূল্যায়ন।

 

 

 

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।