হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুবিশাল আঙিনায় ভৈরব অঙ্গের রাগগুলো সাধারণত ভোরবেলার আলো, আধ্যাত্মিকতা এবং শান্ত স্নিগ্ধতার প্রতীক। কিন্তু এই ভৈরব পরিবারের মধ্যেই এমন কিছু দুর্লভ এবং অনন্য রাগ রয়েছে, যা তাদের অদ্ভুত স্বর বিন্যাসের কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতির জন্ম দেয়। তেমনই এক অত্যন্ত প্রাচীন, বীরত্বপূর্ণ এবং কিছুটা অপ্রচলিত রাগের নাম ‘রাগ বঙ্গাল ভৈরব’।
Table of Contents
রাগ বঙ্গাল ভৈরব: ভৈরব অঙ্গের এক বীরত্বপূর্ণ ও নিভৃতচারী ভোরের সুর
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে যে রাগগুলোর নাম অত্যন্ত সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়, রাগ বঙ্গাল ভৈরব তার মধ্যে অন্যতম। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর প্রাচীন শিকড়—অনেকের মতে প্রাচীন ‘বঙ্গ’ বা বাংলা অঞ্চলের লোকসুরের সাথে শাস্ত্রীয় ভৈরব রাগের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে এই রাগের উৎপত্তি।
অনন্য চরিত্র ও রসের খেলা
ভৈরব অঙ্গের সাধারণ রাগগুলো যেখানে শান্ত, করুণ কিংবা ভক্তি রসে ভরপুর থাকে, সেখানে রাগ বঙ্গাল ভৈরব তার চলনের কারণে এক অনন্য ব্যতিক্রম। এই রাগে ভক্তি রসের পাশাপাশি একটি বীর রস বা তেজোদ্দীপ্ত ভাব ফুটে ওঠে। সকালের উদীয়মান সূর্যের তেজ আর নতুন দিনের আহ্বান যেন এই রাগের স্বরলিপির মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
রাগ বঙ্গাল ভৈরব-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এই রাগের মূল পরিচিতি ও গাণিতিক কাঠামো নিচে তুলে ধরা হলো:
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে ভৈরব ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি মূলত ঔড়ব-ঔড়ব (মতান্তরে স্বরভেদে এর রূপ সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে)। এর আরোহণ এবং অবরোহণ উভয় ক্ষেত্রেই মূলত পাঁচটি করে প্রধান স্বর ব্যবহার করে এর বিশেষ রূপটি ফুটিয়ে তোলা হয়।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো ষড়্জ (স)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো পঞ্চম (প)।
- ব্যবহৃত স্বর: এই রাগে কোমল ঋষভ (ঋ) এবং কোমল ধৈবত (দ) ব্যবহৃত হয়, যা ভৈরব ঠাটের মূল বৈশিষ্ট্য। তবে মধ্যম ও নিষাদ স্বরের বর্জন বা বিশেষ প্রয়োগ একে সাধারণ ভৈরব থেকে আলাদা করে।
- পরিবেশনের সময় (Time): এই রাগ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো দিবা প্রথম প্রহর (ভোরবেলা বা সূর্যোদয়ের সময়)। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় এই রাগের বিস্তার চারপাশের পরিবেশে এক আধ্যাত্মিক ও তেজস্বী আবহ তৈরি করে।
আরোহণ, অবরোহণ ও চলন
রাগ বঙ্গাল ভৈরব তার বিশেষ বক্র গতি এবং তীব্র অথচ মধুর স্বরপ্রয়োগের জন্য পরিচিত। এর সুরের গতিপ্রকৃতি মূলত নিচে দেওয়া স্বরবিন্যাসের মাধ্যমে চেনা যায়:
- আরোহণ: স ঋ গ প দ র্স
- অবরোহণ: র্স দ প গ ঋ স
- পকড় (রাগের মূল রূপ): স ঋ গ প, দ প, গ ঋ স
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী ‘ঋ’ দিয়ে কোমল ঋষভ এবং ‘দ’ দিয়ে কোমল ধৈবতকে নির্দেশ করা হয়েছে, যা ভোরের রাগের গম্ভীরতাকে প্রকাশ করে।)
রাগ বঙ্গাল ভৈরব বর্তমানের সঙ্গীত জলসাগুলোতে খুব একটা বেশি শোনা যায় না। তবে অপ্রচলিত হলেও এর ভেতরের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং বীর ও ভক্তি রসের চমৎকার মিশ্রণ একে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গবেষক ও গুণী শিল্পীদের কাছে এক পরম সম্পদ করে তুলেছে। ভোরের আলোয় এই রাগের আলাপ শুনলে মন এক অদ্ভুত সতেজতা ও আত্মবিশ্বাসে ভরে ওঠে।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।












![কথা বা বানী download 97 আমার হৃদয় একটা লিরিক্স [ Amar Hridoy Ekta Lyrics ] । এন্ড্রু কিশোর এবং কনক চাঁপা । Andrew Kishore & Kanak Chapa](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/06/download-97-1024x536.png)


