আজ ৩১ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ে ৬৯ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী এই সংগীতব্যক্তিত্ব। তাঁর চলে যাওয়ার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও সংগীতের জগতে তাঁর উপস্থিতি আজও অমলিন। বাংলা লোকসংগীতের শেকড়কে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি যে স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন, তা এখনো শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
Table of Contents
রাজপরিবারে জন্ম, শেকড় ছিল বাংলার মাটিতে
১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা শহরের এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মন। তাঁর বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মন ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের বংশধর। মা রাজকুমারী নির্মলা দেবী ছিলেন মণিপুরের রাজপরিবারের কন্যা।
রাজকীয় পারিবারিক ঐতিহ্যে বেড়ে উঠলেও শচীন দেব বর্মনের মন পড়ে থাকত সাধারণ মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে। বাংলার নদী, গ্রাম, নৌকা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন তাঁর সংগীতভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ১৯২০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় সংগীতসাধনার পথে।
লোকসংগীতের সুরে গড়ে ওঠে নিজস্ব সংগীতভুবন
শচীন দেব বর্মনের সংগীতের প্রধান শক্তি ছিল বাংলার লোকজ সুরের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, সারি, ধামাইল ও পল্লিগীতির মতো সংগীতধারা তাঁর সুরসৃষ্টির ভিত গড়ে দেয়। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের নদীকেন্দ্রিক জীবন ও মাঝিদের গান তাঁর সংগীতে বারবার ফিরে এসেছে।
তিনি কেবল লোকগান সংগ্রহ বা পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। লোকসুরের আবেগ ও স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামো এবং আধুনিক সংগীতায়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক সংগীতভাষা।
প্রথাগত সংগীতশিক্ষায় তিনি ওস্তাদ কে সি দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খান এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মতো সংগীতগুণীদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তাঁর সংগীতচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
১৯২০-এর দশকের শেষদিকে কলকাতা বেতারে গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীতজীবনের পরিচিতি বাড়তে থাকে। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। এরপর ধীরে ধীরে তিনি সংগীতাঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
কলকাতা থেকে মুম্বাই: চলচ্চিত্রের সংগীতে নতুন অধ্যায়
বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার মধ্য দিয়ে শচীন দেব বর্মনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩৭ সালে। কলকাতার সংগীতজগতে নিজের পরিচিতি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৪ সালে তিনি বোম্বে, বর্তমান মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তাঁর সামনে খুলে যায় বৃহত্তর চলচ্চিত্রজগতের দরজা।
মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রে তিনি এমন এক সংগীতধারা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে লোকজ সুর, শাস্ত্রীয় সংগীত এবং পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার একসঙ্গে জায়গা পায়। তাঁর সুরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অল্প আয়োজনেও গভীর আবেগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা। অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার না করেও তিনি গানের কথার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুরের আবহ তৈরি করতে পারতেন।
‘দো ভাই’, ‘মুনিমজি’, ‘পেয়িং গেস্ট’, ‘পিয়াসা’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘গাইড’, ‘আরাধনা’ ও ‘অভিমান’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত পরিচালনা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
‘পিয়াসা’ চলচ্চিত্রের বিষণ্ন আবহ, ‘গাইড’-এর বৈচিত্র্যময় সুর এবং ‘আরাধনা’র রোমান্টিক গানগুলো তাঁর সংগীতপ্রতিভার ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে। চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্র ও পরিস্থিতির সঙ্গে সংগীতকে কীভাবে একীভূত করা যায়, সে ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ।
নিজের কণ্ঠেও রেখে গেছেন অমর গান
শচীন দেব বর্মন শুধু একজন সুরকার ছিলেন না, ছিলেন স্বতন্ত্র কণ্ঠের একজন গায়কও। তাঁর কণ্ঠে ছিল গ্রামবাংলার সহজিয়া আবহ, গভীর দরদ এবং একধরনের স্বাভাবিক আবেদন। গায়ক হিসেবে তাঁর পরিবেশনায় কৃত্রিমতা ছিল না; বরং গানের কথার সঙ্গে আবেগের সরাসরি সংযোগ তৈরি হতো।
‘ওরে সুজন নাইয়া’, ‘শোনো গো দখিনা হাওয়া’, ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’ এবং ‘তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’—তাঁর কণ্ঠে গাওয়া এসব গান বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
হিন্দি চলচ্চিত্রেও নিজের কণ্ঠে একাধিক স্মরণীয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘সুন মেরে বন্ধু রে’, ‘ওয়াহাঁ কৌন হ্যায় তেরা’সহ তাঁর গাওয়া গানগুলো শ্রোতাদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয়।
তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের বহু খ্যাতিমান শিল্পী। মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, গীতা দত্ত, মান্না দে, তালাত মাহমুদ ও মুকেশের মতো শিল্পীরা তাঁর সুরে গান গেয়ে সংগীতভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কোন শিল্পীর কণ্ঠে কোন গান সবচেয়ে ভালো ফুটে উঠবে, তা বোঝার ক্ষেত্রে শচীন দেব বর্মনের অসাধারণ দক্ষতা ছিল। গানের কথা, সুরের ধরন ও শিল্পীর কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে তিনি সংগীতায়োজন করতেন। এ কারণেই তাঁর সুরে গাওয়া গানগুলোতে শিল্পীদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও গায়নশৈলী স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বিশেষ করে কিশোর কুমারের সঙ্গে তাঁর সংগীতের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তাঁদের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে বহু জনপ্রিয় গান, যা কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে এখনো সমান প্রিয়।
পুত্র আর ডি বর্মনের সংগীতযাত্রায় পিতার প্রভাব
শচীন দেব বর্মনের পারিবারিক জীবনেও সংগীতের প্রভাব ছিল গভীর। স্ত্রী মীরা দেব বর্মনের সঙ্গে তাঁর সংসারে জন্ম নেন রাহুল দেব বর্মন, যিনি পরবর্তী সময়ে আর ডি বর্মন বা ‘পঞ্চম’ নামে ভারতীয় সংগীতজগতে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন।
পিতার সংগীতচর্চা ও সুরসৃষ্টির পরিবেশে বেড়ে ওঠা আর ডি বর্মন পরবর্তী সময়ে নিজের স্বতন্ত্র সংগীতধারা গড়ে তোলেন। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, নতুন সংগীতায়োজন এবং ভিন্নধর্মী সুরের ব্যবহারে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেন।
দুই প্রজন্মের এই দুই সংগীতস্রষ্টার অবদান ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীত ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একজন লোকজ ও শাস্ত্রীয় সংগীতের মেলবন্ধনে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছেন, অন্যজন সেই ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক সংগীতের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নতুন পথ দেখিয়েছেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ কর্মজীবন
শচীন দেব বর্মনের সংগীতপ্রতিভা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৫৪ সালে ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে সংগীত পরিচালনায় পান সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। পরে ‘অভিমান’ চলচ্চিত্রের জন্যও তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁর অর্জন কেবল পুরস্কার বা সম্মাননার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চলচ্চিত্রের সংগীতে নতুন সুরের ভাষা তৈরি করা এবং লোকসংগীতকে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের স্থায়ী অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।
শেকড়ের টানেই অমর হয়ে আছেন শচীন কর্তা
শচীন দেব বর্মনের সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকালে তাঁর সৃষ্টির একটি বিশেষ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের সাংস্কৃতিক শেকড়কে ধারণ করেছেন। মুম্বাইয়ের ব্যস্ত চলচ্চিত্রজগতে কাজ করেও তাঁর সুরে বারবার ফিরে এসেছে বাংলার নদী, নৌকা, মাঝি, ভাটিয়ালি আর গ্রামীণ জীবনের অনাড়ম্বর সৌন্দর্য।
কলকাতায় তিনি ‘শচীন কর্তা’ নামে পরিচিত ছিলেন। মুম্বাইয়ের সংগীতজগতে অনেকেই তাঁকে ‘বর্মন দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও তাঁর সংগীতের মূল পরিচয় ছিল একটাই—তিনি ছিলেন শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত একজন অসাধারণ সুরস্রষ্টা।
১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মুম্বাইয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগৎ হারায় এক অনন্য প্রতিভাকে। তবে তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। রেডিও, চলচ্চিত্র, রেকর্ড কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে আজও নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা তাঁর গান শুনছেন, আবিষ্কার করছেন তাঁর সুরের বৈশিষ্ট্য।
শচীন দেব বর্মন প্রমাণ করেছেন, সংগীতের শক্তি তার আড়ম্বরের মধ্যে নয়, বরং মানুষের অনুভূতি স্পর্শ করার ক্ষমতায়। বাংলার লোকজ সুরকে তিনি এমনভাবে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, যা ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। তাঁর সৃষ্টিতে একদিকে যেমন ছিল গ্রামবাংলার পরিচিত আবহ, অন্যদিকে ছিল চলচ্চিত্রের উপযোগী আধুনিক সংগীতের বৈচিত্র্য।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন কিংবদন্তি সুরকারকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য ও তার অসীম সম্ভাবনাকেও স্মরণ করা। কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী তাঁর সুরের মাধ্যমে বাংলার মাটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিয়েছেন উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে।
সত্যিকারের শিল্পীর প্রস্থান ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়। শচীন দেব বর্মনের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। তাঁর গান আজও মানুষের ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর সুরে খুঁজে পাবে বাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন আর এক গভীর আবেগের ভাষা।
প্রয়াণ দিবসে সুরসম্রাট শচীন দেব বর্মনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।












![তত্ত্ব আমার স্বপ্ন যে সত্যি হলো [ Amar Shopno Je Sotti Holo ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/আমার-স্বপ্ন-যে-সত্যি-হলো-1024x576.webp)

