সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুন ২০১০, ৯:৫৭ পিএম

সলিল চৌধুরীর গান মানেই একে একে অনেক গান, যা একে অপরকে ঘিরে একটি অপূর্ব সুরের মহাকাব্য সৃষ্টি করে। তাঁর সংগীতে যেমন শাস্ত্রীয় ধারা ছিল, তেমনই পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাবও ছিল। এটি এমন একটি বিশাল সংগীতসমাবেশ, যা বহুবিধ সাংস্কৃতিক রঙের সুতার মতো তৈরি হয়েছে—একটি বিশাল রঙিন কার্পেটের মতো। যার মধ্যে অনুপ্রাণিত ছিল সুরের গভীরতা এবং বৈচিত্র্য।
সলিল চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চিংড়িপোটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন আসামের চা বাগানে, যেখানে তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ চৌধুরী চিকিৎসক ছিলেন। সেই সময় তাঁর বাবা যেমন সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন, তেমনি ছোটবেলাতেই সলিল চৌধুরী চা-শ্রমিকদের গান, আসামি লোকগান এবং প্রাকৃতিক সুরে আকৃষ্ট হন। পাশ্চাত্য সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় বাবা সংগ্রহ করা বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের গ্রামোফোন রেকর্ড শুনে।
১৯৫০-এর দশকে সলিল চৌধুরী মুম্বাই চলে আসেন। সেখানে তাঁর প্রথম সিনেমা ‘দো বিঘা জমিন’-এর জন্য গান রচনা করেছিলেন। সেখান থেকে সলিল চৌধুরীর সিনেমা সুরারোপের যাত্রা শুরু হয়, যার মধ্যে ‘মধুমতী’, ‘আনন্দ’, ‘ছায়া’, ‘পরখ’ ইত্যাদি ছবির গান সমগ্র ভারতবর্ষে জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর সুরের জাদুতে নতুন জীবন্ততা পেয়েছিল বাংলা এবং হিন্দি সংগীতের অনেক শিরোনাম।
সলিল চৌধুরী ছিলেন এমন একজন সংগীতকার, যার গান শুধুমাত্র শিল্পের জন্য ছিল না, বরং সমাজের প্রতিফলন ছিল। তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিটিএ) সক্রিয় সদস্য। তাঁর সংগীত বামপন্থী রাজনীতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। ‘দেশ ভেসেছে বানের জলে’, ‘পৌষালি বাতাসে পাকা ধানের বাসে’, ‘ঢেউ উঠছে/ কারা টুটছে’ ইত্যাদি গান আন্দোলন এবং বিপ্লবের সুর হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সলিল চৌধুরী শুধু সিনেমার গানের সুরকারই ছিলেন না, তিনি আধুনিক বাংলা গানে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর সুরে অনেক শিল্পী গান গেয়েছেন, যার মধ্যে লতা মঙ্গেশকর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মান্না দে, শ্যামল মিত্র প্রমুখ শিল্পীরা ছিলেন। বিশেষ করে ছোটদের গানে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’, ‘এক যে ছিল মাছি’, ‘ও মাগো মা’ ইত্যাদি গানের মাধ্যমে সলিল চৌধুরী শিশুকুলের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
সলিল চৌধুরী সংগীতে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করলেও, তিনি সবসময় বাঙালি ঐতিহ্য ও লোকসংগীতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর সুরে শাস্ত্রীয় সংগীত এবং পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণ একটি নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল। তাছাড়া, ‘মন বন পাখি চন্দনা’ বা ‘আজ নয় গুনগুন’ গানের মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রীয় এবং পশ্চিমী সংগীতকে একত্রিত করেছিলেন।
Table of Contents

সলিল চৌধুরী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার রাজপুর সোনারপুর অঞ্চলের গাজিপুরে এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী, আসামের লতাবাড়ি চা বাগানে ডাক্তারি করতেন। বাবার কাছেই সলিল চৌধুরীর সংগীত শিক্ষার হাতেখড়ি। জ্যাঠাতো দাদা নিখিল চৌধুরীর কাছেও সংগীতের তালিম গ্রহণ করেন তিনি।
মূলত নিখিল চৌধুরীর ঐক্যবাদন দল ‘মিলন পরিষদ’-এর মাধ্যমেই গানের জগতে শৈশবেই সম্পৃক্তি। তার শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছে আসামের চা বাগানে। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সুভাষগ্রামে, (পুরাতন নাম কোদালিয়া) মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন। হারিনাভি বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং উচ্চ মাধ্যমিক (আইএসসি) পাশ করেন। এরপর কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।
ছোটবেলা থেকেই তিনি তার পিতার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন। তার পিতা চা বাগানের কুলি এবং স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের সাথে মঞ্চ নাটকের জন্য সুখ্যাতি সম্পন্ন[৩] ছিলেন। তিনি কলকাতায় অবস্থিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বঙ্গবাসী কলেজ[৩] থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং এ সময়েই তার সঙ্গীত জ্ঞানে পরিপক্কতা লাভের পাশাপাশি দ্রুত তার রাজনৈতিক ধারণা জন্মায়। তিনি দারুণ মেধা সম্পন্ন ছিলেন।
১৯৪৪ সালে যখন তরুণ সলিল তার স্নাতক পড়াশোনার জন্য কলকাতায় আসেন, তখনই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক দল ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-এ (Indian Peoples Theater Association) যোগ দেন। এ সময় তিনি গণসঙ্গীত লিখতে এবং এর জন্য সুর করা শুরু করেন। আইপিটিএ এর সাংস্কৃতিক দলটি বিভিন্ন শহর এবং গ্রামগঞ্জে ভ্রমণ করতে থাকে, যা এই গানগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। বিচারপতি , রানার এবং অবাক পৃথিবীর মত গানগুলো তখন সাধারণ জনতার কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
গাঁয়ের বধু মত গান তখন বাংলা সঙ্গীতে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিল, যা মাত্র ২০ বছর বয়সে সুর করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে তখনকার প্রায় প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী এসব গান গেয়েছেন। এর মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
তার প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র “পরিবর্তন” মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে। তার ৪১টি বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল “মহাভারতী” যা ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায়।
১৯৫৩ সালে বিমল রায় পরিচালিত দো ভিঘা জামিন চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সলিল চৌধুরীর হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পে অভিষেক ঘটে। সলিল চৌধুরীর ছোট গল্প “রিকসাওয়ালা” অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। এই চলচ্চিত্রটি তার কর্মজীবনকে নতুন মাত্রা যোগ করে যখন এটি প্রথমে ফিল্মফেয়ার সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নেয়।
বাংলা এবং হিন্দি চলচ্চিত্রে ২০ বছর কাজ করার পরে সলিল ১৯৬৪ সালে চিম্মিন দিয়ে মালয়ালম চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। চলচ্চিত্র সফলতা পাক বা না পাক তার মালয়ালম গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
তিনি প্রায় ৭৫টির বেশি হিন্দি চলচ্চিত্র, ৪০টির বেশি বাংলা চলচ্চিত্র, প্রায় ২৬টি মালয়ালম চলচ্চিত্র, এবং বেশ কিছু মারাঠী, তামিল, তেলুগু, কান্নাডা, গুজরাটি, ওড়িয়া এবং অসামীয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন।
সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতে পশ্চিমা এবং ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সমান মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। সলিল চৌধুরীর পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সরাসরি অভিযোজনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল,
ছায়া চলচ্চিত্রে মোৎজার্টের সিম্ফোনি নং ৪০ এর উপর ভিত্তি করে – “ইতনা না মুঝে তু পেয়ার বাড়া ”
অন্যদাতা চলচ্চিত্রে শপ্যাঁর কাজের উপর ভিত্তি করে -“রাতো কি সায়ে ঘানে ”
কবিতা
প্রান্তরের গান
সলিল চৌধুরীর গান (১৯৮৩)

সলিল চৌধুরী ১৯৫২ সালে চিত্রকর জ্যোতি চৌধুরীকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের তিন সন্তান ছিল। পরবর্তীতে তিনি গায়িকা সবিতা চৌধুরীকে বিয়ে করেন। সলিল চৌধুরী ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাঁর সুরগুলি আজও বাংলার মানুষের মনে জীবন্ত।
মন্তব্য