সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ৬:৫১ পিএম

বাংলা গানের দিগন্ত বিস্তৃত আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সুরের মায়াজালে বাঙালিকে মুগ্ধ করে রেখেছেন। তিনি আর কেউ নন, বাংলা গানের জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান। এবার তিনি শ্রোতা ও পাঠকদের সামনে হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয়ে। প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে এই সুরসম্রাজ্ঞীকে শুভেচ্ছা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপাসহ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের একঝাঁক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
নিজের গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গানের অমর চরণ থেকেই বইটির নাম বেছে নিয়েছেন ফেরদৌসী রহমান। নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা দর্শনের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি অনুষ্ঠানে বলেন, গান ও সংগীতের প্রতি যে গভীর অনুরাগ, সেটিই তাঁর জীবনের আসল ‘প্রেম’। আর এই প্রেম বা ভালোবাসাকে আজীবন বুকে ধারণ করতে গিয়ে যে নিরন্তর সাধনা, ত্যাগ, চড়াই-উতরাই ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটিই তাঁর কাছে ‘জ্বালা’। জীবনের এই অম্লমধুর অভিজ্ঞতাকেই তিনি সহজ সরল ভাষায় মলাটবন্দি করেছেন।
নিজের জীবন ও কাজের প্রতি বিনয় প্রকাশ করে এই গুণী শিল্পী বলেন, তিনি নিজে বিশেষ বড় কোনো কাজ করতে পেরেছেন বলে মনে করেন না। তবে বইটিতে তাঁর নিজের চেয়েও অনেক চেনা-অচেনা মানুষের কথা এবং ফেলে আসা সময়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ রয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার আবহ, হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্যাভ্যাস ও মানুষের সরল জীবনযাপনের খণ্ড খণ্ড চিত্র পাঠকদের নস্টালজিক করে তুলবে।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সহশিল্পীর দীর্ঘ সংগীতজীবনের স্মৃতি রোমন্থন করেন প্রবীণ শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি। তিনি জানান, ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার একসঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই পেশাদার ও পারিবারিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়। তিনি উল্লেখ করেন, কিংবদন্তি পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের সুযোগ্য কন্যা হওয়ায় ফেরদৌসী রহমান শৈশব থেকেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞদের সান্নিধ্য ও স্নেহ পেয়েছেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্যে কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ফেরদৌসী রহমানকে বাংলা সংগীতের ‘হিমালয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, আধুনিক গান, নজরুলসংগীত, ধ্রুপদী গান থেকে শুরু করে পল্লীগীতি—সব ধারার সংগীতে এমন ঈর্ষণীয় দক্ষতা ও পাণ্ডিত্য পুরো উপমহাদেশেই বিরল। অনুষ্ঠানের আবহকে আরও সুরময় করে তুলতে শুরুতেই শিল্পী অনুপমা মুক্তি ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া কালজয়ী দুটি গান ‘লোকে বলে প্রেম’ এবং ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’ গেয়ে শোনান।
১৯৪১ সালের ২৮ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী রহমান। বাবার হাত ধরেই তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি। ১৯৪৭ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে রেডিও পাকিস্তানে তাঁর কণ্ঠে প্রথম গান প্রচারিত হয়। দেশভাগের পর পরিবারসহ তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক বা চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ষাট ও সত্তরের দশকে প্রায় ২৫০টি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়ে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা টেলিভিশনের (বর্তমানে বিটিভি) উদ্বোধনী দিনের অনুষ্ঠানেও তিনি প্রথম গান পরিবেশন করেছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালজয়ী শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’-র ‘খালামণি’ হিসেবে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গানের দীক্ষা দিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে সেরা সংগীত পরিচালক হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এছাড়া দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। তাঁর এই নতুন আত্মজীবনীটি বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলা সংগীতের এক অমূল্য দলিল হয়ে থাকবে।
মন্তব্য