হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত ‘রাগ বাঙ্গাল ভৈরব’ (বা বঙ্গাল ভৈরব) এক অত্যন্ত প্রাচীন, বিরল এবং গম্ভীর প্রকৃতির প্রাতঃকালীন রাগ। প্রচলিত বিশুদ্ধ ভৈরব রাগের সাথে এর প্রধান তফাত হলো—এতে কোমল ধৈবতের পরিবর্তে শুদ্ধ ধৈবত-এর প্রয়োগ ঘটে এবং আরোহণে স্বর সঞ্চার ওড়ব বা ষাড়ব গতিতে পরিচালিত হয়। প্রাতঃকালের শান্ত পরিবেশ, আত্মনিবেদন এবং উপাসনার ভাব প্রকাশে এই রাগের স্বর-সংগতি অত্যন্ত উপযোগী।
Table of Contents
ঐতিহাসিক পটভূমি ও বঙ্গাল অঙ্গের উৎস
প্রাচীন সঙ্গীত গ্রন্থাবলীতে (যেমন সঙ্গীত রত্নাকর) ‘বঙ্গাল’ বা ‘বাঙাল’ গীতি-অঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের আঞ্চলিক সুর ও স্বরপ্রবাহ কালক্রমে মার্গ সঙ্গীতের ভৈরব কাঠামোর সাথে মিশ্রিত হয়ে এই রাগের উদ্ভব ঘটে। সঙ্গীত পণ্ডিত ও গুণী সাধকগণ ভৈরব রাগের মূল কাঠামোর সাথে শুদ্ধ ধৈবত ও নির্দিষ্ট আরোহী-অবরোহী চলন যুক্ত করে রাগ বাঙ্গাল ভৈরবকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রীয় মর্যাদা দান করেন।
রাগ বাঙ্গাল ভৈরব-এর শাস্ত্রীয় পরিচয় ও রূপরেখা
রাগ বাঙ্গাল ভৈরবকে ভৈরব ঠাটের জন্য রাগ হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে কোমল ঋষভ ব্যবহৃত হলেও ধৈবতটি শুদ্ধ হওয়ায় এর রূপ প্রচলিত বিশুদ্ধ ভৈরব (যা কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত যুক্ত) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
- ঠাটের নাম: ভৈরব
- জাতি: ওড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে গান্ধার ও নিষাদ বর্জিত বা বক্র; অবরোহণ সম্পূর্ণ)
- বাদী স্বর: মধ্যম (ম) / কোমল ঋষভ (ঋ)
- সংবাদী স্বর: ষড়জ (স) / শুদ্ধ ধৈবত (ধ)
- প্রকৃতি/ভাব: অত্যন্ত গম্ভীর, শান্ত ও ভক্তিপ্রধান
- গায়নের সময়: প্রাতঃকাল (দিনের প্রথম প্রহর, সকাল ৬টা থেকে ৯টা)
- প্রধান অঙ্গ: ভৈরব অঙ্গ ও বঙ্গাল অঙ্গ
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ), শুদ্ধ গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (ধ) এবং শুদ্ধ নিষাদ (ন)
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
- আরোহণ: স ঋ ম প ধ র্স (বা: স ঋ ম প ন র্স)
- অবরোহণ: র্স ন ধ প ম গ ঋ স
- পকড় (বিশেষ স্বরগুচ্ছ): স ঋ ম প, ধ প ম গ, ঋ স; বা ম প ধ প, ম গ ঋ স
স্বর-প্রয়োগের সূক্ষ্মতা ও বৈচিত্র্য
১. শুদ্ধ ধৈবতের (ধ) প্রয়োগ
সাধারণ বিশুদ্ধ ভৈরব রাগে কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত (ঋ, দ) ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাঙ্গাল ভৈরবে কোমল ঋষভের (ঋ) পাশাপাশি শুদ্ধ ধৈবত (ধ) ব্যবহার করাই এই রাগের সবচেয়ে প্রধান ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
২. আরোহণে স্বর বর্জন (ওড়বত্ব)
আরোহণকালে গান্ধার (গ) এবং নিষাদ (ন) সরাসরি ব্যবহার না করে কিছুটা বক্রভাবে প্রয়োগ করা হয় বা এড়িয়ে যাওয়া হয় (যেমন: স ঋ ম প ধ র্স)। এতে ভৈরব রাগের সাধারণ ছায়া থেকে এটি মুক্ত হয়ে নিজস্ব ‘বঙ্গাল’ অঙ্গ লাভ করে।
৩. কোমল ঋষভের মেণ্ড ও আন্দোলন
ভৈরব অঙ্গের নিয়ম অনুযায়ী কোমল ঋষভের (ঋ) ওপর ধীর আন্দোলন এবং ‘ম গ ঋ স’ বা ‘গ ঋ স’ স্বরগুচ্ছে মসৃণ মেণ্ড প্রয়োগ করা হয়, যা রাগে করুণ ও শান্ত রসের সঞ্চার করে।
ভৈরব অঙ্গের অন্যান্য রাগের সাথে তুলনা
ভৈরব ঠাটের অধীনে একাধিক বৈচিত্র্যময় রাগ থাকলেও বাঙ্গাল ভৈরব তার স্বরচয়নের কারণে অনন্য:
- শুদ্ধ ভৈরব: কোমল ঋষভ (ঋ) ও কোমল ধৈবত (দ) ব্যবহৃত হয়।
- আহীর ভৈরব: কোমল ঋষভ (ঋ), শুদ্ধ ধৈবত (ধ) ও কোমল নিষাদ (ণ) ব্যবহৃত হয়।
- আনন্দ ভৈরব: কোমল ঋষভ (ঋ) ও শুদ্ধ ধৈবত (ধ) ব্যবহৃত হলেও এর আরোহণ-অবরোহণ সম্পূর্ণ ভিন্ন চলনের।
- বাঙ্গাল ভৈরব: কোমল ঋষভ (ঋ), শুদ্ধ ধৈবত (ধ) ও শুদ্ধ নিষাদ (ন)-এর সমন্বয়ে ওড়ব-সম্পূর্ণ গতিতে পরিচালিত হয়।

রাগ বাঙ্গাল ভৈরব ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক মহামূল্যবান সম্পদ। প্রাতঃকালের নির্জনতায় কোমল ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবতের অপূর্ব সংমিশ্রণ শ্রোতার মনে সৃষ্টি করে এক স্বর্গীয় ও অমলিন প্রশান্তি।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।








![এক চোখেতে হাসন কান্দে [ Ek Chokete Hason Kande ] 4 এক চোখেতে হাসন কান্দে [ Ek Chokete Hason Kande ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/এক-চোখেতে-হাসন-কান্দে-1024x576.webp)
![আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব [ Ami Taray Taray Rotiye Debo ] 5 আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব [ Ami Taray Taray Rotiye Debo ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/আমি-তারায়-তারায়-1024x576.webp)





