হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ভাণ্ডারে এমন কিছু রাগ রয়েছে যা অত্যন্ত নিভৃতচারী এবং দুর্লভ। সুরের জটিলতা আর অপ্রচলিত চলনের কারণে এগুলো সাধারণ জলসায় খুব একটা শোনা যায় না। তেমনই এক অত্যন্ত বিরল, রহস্যময় এবং নিস্তব্ধ সন্ধ্যার রাগ হলো ‘রাগ মালবী’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি বিখ্যাত ‘শ্রী অঙ্গ’-এর একটি বিশেষ রাগ হিসেবে পরিচিত।
রাগ মালবী: শ্রী অঙ্গের এক নিভৃতচারী ও রহস্যময় সন্ধ্যার সুর
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জগতে কিছু রাগ যুগের পর যুগ ধরে সমানভাবে গীত হলেও, কিছু রাগ কালের আবর্তে বেশ অপ্রচলিত এবং পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে। রাগ মালবী তেমনই এক বিরল ও নিভৃতচারী রাগ। ঠাটের বিচারে পণ্ডিতেরা একে পূরবী ঠাটের অন্তর্গত করেছেন।
রাগটি এতটা অপ্রচলিত ও দুর্লভ যে, সঙ্গীতশাস্ত্রে এর বাদী স্বর, সমবাদী স্বর কিংবা ন্যাসের (যে স্বরে সুর থামানো বা বিশ্রাম নেওয়া হয়) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এর স্বর প্রয়োগের একটি বিশেষত্ব হলো—এর অবরোহণে ধৈবত (ধা) স্বরটি অত্যন্ত দুর্বলভাবে অর্থাৎ খুব সূক্ষ্ম ও সাবধানে ব্যবহার করা হয়।
রাগ মালবী-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী রাগ মালবীর মূল পরিচিতি ও কাঠামো নিচে তুলে ধরা হলো:
- রাগের অঙ্গ: এটি মূলত শ্রী অঙ্গের রাগ।
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি পূরবী ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ষাড়ব-সম্পূর্ণ।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): বিস্তারিত জানা যায় না (অনির্ণীত)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): বিস্তারিত জানা যায় না (অনির্ণীত)।
- অঙ্গ (Anga): বিস্তারিত জানা যায় না (অনির্ণীত)।
- পরিবেশনের সময় (Time): এই রাগ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো সায়ংকালীন সন্ধিপ্রকাশ (অর্থাৎ দিন ও রাতের সন্ধিক্ষণ বা গোধূলি বেলা)।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগের সেই রহস্যময় এবং কোমল-তীব্র স্বরের চলনটি স্বরলিপির মাধ্যমে বোঝার জন্য এর মূল রূপ নিচে দেওয়া হলো:
- আরোহণ: স ঋ গ হ্ম প দ র্স
- অবরোহণ: স ন দ প হ্ম গ ঋ স
- পকড় (রাগের মূল রূপ): ন্ ঋ গ, হ্ম প দ প, হ্ম ঋ গ, দ হ্ম, ঋ স
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নিয়ম অনুযায়ী ‘হ্ম’ দিয়ে তীব্র মধ্যম এবং ‘ঋ’ ও ‘দ’ দিয়ে যথাক্রমে কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবতের বিশিষ্ট চলনকে নির্দেশ করা হয়েছে।)
তথ্যসূত্র
এই বিরল রাগের তাত্ত্বিক ও গঠনগত বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী রচিত ‘রাগ-রূপায়ণ’ (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
রাগ মালবী তার অপ্রচলিত রূপের কারণে হয়তো সাধারণের কাছে কিছুটা অচেনা, কিন্তু দিন শেষের সায়ংকালীন শান্ত পরিবেশে এই রাগের স্বরগুলোর মূর্চ্ছনা শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য আর আধ্যাত্মিক ভাবের জন্ম দেয়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া এই সঙ্গীত ঐতিহ্যকে চেনার জন্য মালবীর মতো রাগের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পূরবী ঠাটের এই দুর্লভ রাগটি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
