বাঙালির আত্মপরিচয় ও দেশপ্রেমের কথা উঠলেই মনের ভেতর গুনগুন করে ওঠে একটি কালজয়ী সুর—“ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা…”। এই একটি গান দিয়েই যিনি চিরকালের জন্য প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছেন, তিনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (যাঁকে দুনিয়া চেনে ‘ডি. এল. রায়’ নামে)। তিনি কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, অনন্য গীতস্রষ্টা এবং সুরকার। প্রায় ৫০০ গানের এক সুবিশাল ভাণ্ডার তৈরি করে তিনি বাংলা সঙ্গীতে “দ্বিজেন্দ্রগীতি” নামক এক নতুন ও স্বতন্ত্র ধারার জন্ম দিয়েছিলেন। একই সাথে বাংলা নাট্যসাহিত্যের মঞ্চে ঐতিহাসিক নাটক ও তীক্ষ্ণ প্রহসনের মাধ্যমে তিনি যে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তা আজও সমাদৃত।
Table of Contents
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় | বাঙালি কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা

কৃষ্ণনগরের দেওয়ান বাড়ি ও সুরের শৈশব
১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ঐতিহাসিক কৃষ্ণনগরে জন্ম নেন দ্বিজেন্দ্রলাল। তাঁর পিতা কার্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন কৃষ্ণনগর রাজবংশের দেওয়ান। তবে পিতার বড় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন সে আমলের এক প্রখ্যাত খেয়াল গায়ক ও উচ্চমানের সাহিত্যিক। তাঁদের বাসভবনটি ছিল সমকালীন গুণীজন ও সঙ্গীতশিল্পীদের এক মস্ত বড় মিলনমেলা। মা প্রসন্নময়ী দেবীও ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত বৈষ্ণব বংশের কন্যা।
পারিবারিক এই সাহিত্য ও সঙ্গীতের আবহে দ্বিজেন্দ্রলালের শৈশব কেটেছিল সুরের চাদরে বুঁদে থেকে। শুধু পিতাই নন, তাঁর দুই দাদা—রাজেন্দ্রলাল ও হরেন্দ্রলাল রায়, এবং বৌদি মোহিনী দেবীও ছিলেন পুরোদস্তুর সাহিত্যিক। এমন এক সৃষ্টিশীল পরিমণ্ডলে বড় হওয়ার কারণে খুব অল্প বয়সেই দ্বিজেন্দ্রলালের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কবিসত্তা ডানা মেলতে শুরু করে।
মেধার আলো, বিলেত যাত্রা ও সমাজের অন্ধ কুসংস্কারের মুখে চপেটাঘাত
পড়াশোনায় দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন তুখোড় মেধাবী। ১৮৭৮ সালে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করে তিনি কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে এফ.এ. এবং হুগলি কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেন। এরপর ১৮৮৪ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর এই মেধার ওপর ভর করেই তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে সুদূর ইংল্যান্ডে যান কৃষিবিদ্যা নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে। সেখানে ‘রয়্যাল অ্যাগ্রিকালচারাল কলেজ’ এবং ‘অ্যাগ্রিকালচারাল সোসাইটি’ থেকে তিনি FRAS, MRAC ও MRAS-এর মতো সম্মানজনক ডিগ্রি লাভ করেন। বিলেতে থাকাকালীন ১৮৮৬ সালে তাঁর একমাত্র ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘Lyrics of Ind’ প্রকাশিত হয়।
তিন বছর পর যখন এই উচ্চশিক্ষিত তরুণ বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরলেন, তখন তৎকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন ও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের এক অংশ তাঁর দিকে আঙুল তুলল। সমুদ্র পার হয়ে বিলেত যাওয়ার ‘অপরাধে’ সমাজ তাঁকে জাতে তুলতে “প্রায়শ্চিত্ত” করার নিদান দিল। কিন্তু আত্মসম্মানী দ্বিজেন্দ্রলাল এই অন্ধ কুসংস্কারের কাছে মাথা নত করতে বা কোনো রকম তথাকথিত প্রায়শ্চিত্ত করতে সাফ অস্বীকার করলেন। ফলস্বরূপ, সমাজ তাঁকে সামাজিকভাবে বয়কট করে। কিন্তু সমাজের এই অন্ধ আক্রোশ তাঁর ভেতরের প্রগতিশীল চেতনাকে এক চুলও দমাতে পারেনি।
কৃষকের অধিকারের লড়াই এবং রাজকীয় কর্মজীবন
দেশে ফিরে তিনি জরিপ ও করমূল্যায়ন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন এবং মধ্যপ্রদেশে সরকারি দপ্তরে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি দিনাজপুরে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৮৮৭ সালে তিনি প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের কন্যা সুরবালা দেবীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন।
চাকরি জীবনে দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন একজন সৎ এবং প্রজাদরদী কর্মকর্তা। ১৮৯০ সালে বর্ধমান এস্টেটের সুজামুতা পরগনায় সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে কাজ করার সময় কৃষকদের খাজনা ও অধিকার নিয়ে বাংলার ইংরেজ গভর্নরের সাথে তাঁর সরাসরি তুমুল বিবাদ বাঁধে। তিনি সাহেবের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দরিদ্র কৃষকদের পক্ষ নিয়েছিলেন, যা তাঁর মেরুদণ্ডী ও আপসহীন চরিত্রের এক অনন্য প্রমাণ। পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন।
সৃষ্টির আকাশ: দ্বিজেন্দ্রগীতি ও নাটকের মায়াজাল
দ্বিজেন্দ্রলালের সাহিত্যকর্ম ছিল বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যে ভরপুর। তিনি মূলত দুটি ধারায় বাঙালির মন জয় করেছিলেন:
১. সঙ্গীতের জাদুকর (দ্বিজেন্দ্রগীতি)
তিনি প্রায় ৫০০ গান রচনা করেন। তাঁর গানে যেমন ছিল দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, তেমনই ছিল প্রেম, মানবিকতা ও সামাজিক চেতনার এক অদ্ভুত মিশেল। তাঁর লেখা—
“ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা”
“বঙ্গ আমার! জননী আমার! ধাত্রী আমার! আমার দেশ”
এই গানগুলো আজও যেকোনো সংকটে বা উৎসবে বাঙালির দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে এক লহমায় উজ্জীবিত করে তোলে।
২. মঞ্চ কাঁপানো নাট্যসম্ভার
বাংলা নাট্যসাহিত্যে তিনি ছিলেন এক আধুনিক রূপকার। তাঁর নাটকগুলোকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
ঐতিহাসিক নাটক: ইতিহাসকে কেবল তুলে ধরাই নয়, বরং ইতিহাসের ভেতরের মানবিক দ্বন্দ্বকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন থিয়েটারের পর্দায়। তাঁর লেখা ‘রাণা প্রতাপসিংহ’, ‘দুর্গাদাস’, ‘মেবার পতন’, ‘নূরজাহান’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ এবং অমর নাটক ‘সাজাহান’ (যার ‘মেহেদি হাসান’ বা ‘দিলদার’ চরিত্রগুলো আজও বিখ্যাত) বাংলা নাটকের জগতে একেকটি মাইলফলক।
প্রহসন ও ব্যঙ্গাত্মক নাটক: সমাজের ভণ্ডামি আর অন্ধ অনুকরণকে চাবুক মারতে তিনি প্রহসন লিখতেন। রসবোধ ও ব্যঙ্গের প্রখরতায় এগুলো ছিল অনন্য। যেমন তাঁর সেই বিখ্যাত মজাদার চুটকি—
“স্ত্রীর চেয়ে কুমীর ভাল বলেন সর্বশাস্ট্রী / ধরলে কুমীর ছাড়ে বরং, ধরলে ছাড়ে না স্ত্রী।”
কাব্যনাট্য ও সামাজিক নাটক: কাব্যভাষায় রচিত নাটক এবং সমসাময়িক সমাজের কুপ্রথা ও রীতিনীতির কড়া সমালোচনা করে তিনি বেশ কিছু সামাজিক নাটকও লিখেছিলেন। এছাড়া কাব্যগ্রন্থের মধ্যে তাঁর ‘আর্যগাথা’ (১ম ও ২য় ভাগ) এবং ‘মন্দ্র’ বিশেষভাবে সমাদৃত।
অকাল প্রয়াণ
১৯১৩ সালের ১৭ মে, কলকাতার বুকে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই সুর ও নাটকের বরপুত্রের জীবনাবসান ঘটে। বড্ড অল্প বয়সেই চলে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালের মধ্যেই তিনি বাঙালিকে দিয়ে গেছেন এমন এক সাংস্কৃতিক সম্পদ, যা শতাব্দী পেরিয়ে আজও সমান সতেজ।

ডি. এল. রায় কেবল একজন লেখক বা সুরকার নন, তিনি ছিলেন বাঙালির রুচি ও আত্মসম্মানের এক জীবন্ত প্রতীক। সাহেবদের চাকরি করেও সাহেবদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আর কুসংস্কারের মুখে দাঁড়িয়ে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ না করার যে জেদ তিনি দেখিয়েছিলেন—সেই জেদটাই ফুটে উঠেছিল তাঁর নাটকের সংলাপে আর গানের সুরে। যতদিন পৃথিবীতে বাংলা ভাষা আর বাঙালি থাকবে, মহাবিশ্বের বুকে এই “ধনধান্য পুষ্পভরা” রূপসী বাংলাকে ভালোবেসে দ্বিজেন্দ্রলালের সুরকে বাঙালি বুকে আগলে রাখবে।
