নাভেদ পারভেজ | বাঙালি সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, আয়োজক ও প্রযোজক

বিগত এক দশকে বাংলাদেশের সিনেমা এবং নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ও সাউন্ড ডিজাইনে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। মেলোডির চেনা ধাঁচের সাথে ওয়েস্টার্ন প্রোগ্রামিং, হিপহপ বিট আর লফি (Lo-Fi) সংস্কৃতির যে ফিউশন আমরা আজকাল শুনি, তার পেছনে যে কজন তরুণ জাদুকর কাজ করছেন—নাভেদ পারভেজ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন সুরকার বা সঙ্গীত পরিচালক নন; তিনি মূলত একজন আন্তর্জাতিক মানের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার এবং মিউজিক প্রডিউসার। সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড় হয়েও নিজের বুকের ভেতর বাংলা গানের যে মায়া তিনি পুষে রেখেছিলেন, সেটাই আজ তাঁকে নিয়ে এসেছে ঢালিউডের একদম প্রথম সারির সিনেমাগুলোর টাইটেল ট্র্যাকে।

নাভেদ পারভেজ | বাঙালি সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, আয়োজক ও প্রযোজক

নাভেদ পারভেজ
নাভেদ পারভেজ

মিরপুর থেকে নিউ ইয়র্ক: প্রবাসের এক লড়াকু শৈশব

নাভেদের জন্ম ও শৈশবের শুরু ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মিরপুর এলাকায়। তবে ২০০৫ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে তিনি পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নতুন এক দেশ, সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি—বিদেশের সেই শুরুর দিনগুলোতে টিকে থাকার জন্য তাঁর পরিবারকে বেশ বড়সড় সংগ্রাম করতে হয়েছিল। সেই একাকীত্ব আর সংগ্রামের দিনগুলোতে নাভেদের একমাত্র সঙ্গী ছিল মিউজিক। বন্ধুদের সাথে হিপহপ আর র‍্যাপ শুনতে শুনতেই মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের শোবার ঘরটিকে বানিয়ে ফেলেন ছোট্ট এক হোম স্টুডিও এবং শুরু করেন সাউন্ড প্রোগ্রামিং ও সুরের খেলা।

পড়াশোনাতেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ব্রুকলিন কলেজ থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে (BBA) সফলভাবে স্নাতক শেষ করেন নাভেদ। তবে শিকড়ের টান এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে পরবর্তীতে তিনি গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায় প্রশাসনেই তাঁর স্নাতকোত্তর (MBA) ডিগ্রিও সম্পন্ন করেন।

অনুপ্রেরণা হাবিব ওয়াহিদ এবং ফেসবুকে সেই একটি ফোন কল

সুদূর প্রবাসে বসে যখন নাভেদ পশ্চিমা ধারার গান শিখছিলেন, ঠিক তখনই বাংলাদেশে অলক্ষ্যে এক মিউজিক বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন হাবিব ওয়াহিদ ও ফুয়াদ আল মুকতাদির। হাবিবের ‘কৃষ্ণ’, ‘মায়া’ আর ফুয়াদের ‘রি-ইভোল্যুশন’ অ্যালবামের আধুনিক সাউন্ড নাভেদকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন দেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাজ করার। ইন্টারনেট ঘেঁটে ট্র্যাক বানিয়ে তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গুণী পরিচালক ও তারকাদের ডেমো মিউজিক পাঠাতে থাকেন। বহু ব্যর্থতা ও হতাশার পর, একদিন তাঁর সেই ডেমো ট্র্যাকগুলো নজরে আসে তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক আশিকুর রহমানের।

আশিকুর রহমান নাভেদের বৈচিত্র্যময় সাউন্ড সেন্স দেখে মুগ্ধ হন এবং ২০১৪ সালে তাঁর বিগ বাজেট সিনেমা ‘কিস্তিমাত’-এর সঙ্গীত পরিচালনার মস্ত বড় দায়িত্ব তুলে দেন এই তরুণের কাঁধে। সিনেমার প্রযোজক যখন নাভেদকে পারিশ্রমিক ঠিক করার জন্য ফোন দিয়েছিলেন, উত্তেজনায় নাভেদ তখন ঠিক কী বলবেন বুঝেই উঠতে পারছিলেন না—কারণ তিনি তো কেবল একটা সুযোগ খুঁজছিলেন! ‘কিস্তিমাত’ ছবিতে তাঁর করা রোমান্টিক গান “শুধু একবার বল” (কণ্ঠ: পড়শী ও শাহিন খান) মুক্তির পরপরই চারদিকে অভাবনীয় সাফল্য পায় এবং রাতারাতি ইন্ডাস্ট্রি চিনে নেয় নতুন এক প্রতিভাকে।

ঢালিউড থেকে বলিউড: আন্তর্জাতিক আঙিনায় নাভেদ

‘কিস্তিমাত’-এর সাফল্যের পর নাভেদকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আশিকুর রহমানের পরের ছবি ‘মুসাফির’-এ তিনি টাইটেল ট্র্যাকের মাধ্যমে ঢাকাই সিনেমায় প্রথমবার আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের র‍্যাপ ও ওয়েস্টার্ন সাউন্ডের এক অনবদ্য মিশ্রণ ঘটান। এরপর ‘যদি একদিন’, ‘অস্তিত্ব’, ‘ওমর’, কিংবা রায়হান রাফীর তুমুল আলোচিত ছবি ‘পরান’ ও মেগাস্টার শাকিব খানের ব্লকবাস্টার ‘তুফান’ ও ‘তাণ্ডব’ সিনেমার একাধিক গান ও টাইটেল ট্র্যাকের সঙ্গীতায়োজন করে তিনি নিজেকে ঢালিউডের অন্যতম ভরসার নাম হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

তবে নাভেদের কাজের পরিধি শুধু দেশের গণ্ডিতেই আটকে নেই, তিনি পা বাড়িয়েছেন আন্তর্জাতিক ভুবনেও। বলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রথম সারির সঙ্গীত পরিচালক অমল মালিকের সাথে অতিরিক্ত সাউন্ড প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। রণবীর কাপুর অভিনীত ‘রয়’ সিনেমার সুপারহিট গান “সুরাজ ডুবা হ্যায়”-তে (কণ্ঠ: অরিজিৎ সিং) নাভেদের মিউজিক প্রোগ্রামিংয়ের ছোঁয়া রয়েছে। এছাড়া বিখ্যাত আন্তর্জাতিক পাঞ্জাবি শিল্পী ফ্লিন্ট জে (Flint J)-এর প্রজেক্টেও সঙ্গীতায়োজন ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করছেন নাভেদ, যার মধ্যে “রুলা হো গ্যায়া” গানটি অন্যতম।

জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য কাজের খতিয়ান

নাভেদের সুর ও সঙ্গীতায়োজনে দেশের প্রায় সমস্ত নামী তারকা কণ্ঠ দিয়েছেন। কণা, কর্নিয়া, জুয়েল মোর্শেদ, লুইপা, স্বপ্নীল সজীব, তামান্না প্রমি থেকে শুরু করে আসিফ আকবর কিংবা তাহসান ও কোনালের গাওয়া ট্র্যাকিংয়েও নাভেদের জাদু ছিল স্পষ্ট। ২০২০ সালে দেশের প্রতি এক গভীর টান থেকে গীতিকার রবিউল ইসলাম জীবনের কথায় তিনি তৈরি করেন এক অনবদ্য সৃষ্টি—“বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ”।

নাটকের গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের নতুন দুয়ার

সিনেমার পাশাপাশি নাভেদ এখন সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন টেলিভিশন নাটক ও ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের ওয়েব সিরিজের জন্য। বিশেষ করে নির্মাতা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের নাটকে আবহ সঙ্গীত (Background Score) এবং গানের ব্যবহারে নাভেদ এক নতুন জোয়ার এনেছেন। নাভেদের নিজস্ব দর্শন হলো—এখনকার যুগে নাটকের গানই ট্রেন্ড তৈরি করছে। আগে নাটকে আবহ সঙ্গীতকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া না হলেও, এখন নির্মাতারা আলাদা করে কম্পোজারদের বাজেট দিচ্ছেন, যা ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

নাভেদ পারভেজ
নাভেদ পারভেজ

আমেরিকার ব্রুকলিন থেকে পড়াশোনা শেষ করে করপোরেট লাইফের চেনা ছকে না গিয়ে নাভেদ বেছে নিয়েছেন সুরের এক আনপ্রেডিক্টেবল দুনিয়া। আজ তিনি দেশে-বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত। গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের সাউন্ড কীভাবে বাংলা গানে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়—নাভেদ পারভেজ প্রতিনিয়ত সেই সাধনাই করে যাচ্ছেন এবং তরুণ শ্রোতাদের কাছে বাংলা গানকে আরও বেশি বৈচিত্র্যময় ও আধুনিক করে তুলছেন।

Leave a Comment