নদীমাতৃক বাংলার রূপ, খরস্রোতা নদীর রুদ্র রূপ এবং মাঝির বিপজ্জনক জীবনযাত্রার সাথে কূলের মানুষের গভীর উৎকণ্ঠার এক চিরন্তন লোকায়ত সৃষ্টি “কল কল ছল ছল নদী করে টলমল”। মূল গীতিকার ও সুরকার এ কে এম আব্দুল আজীজের অমর সৃষ্টি এবং কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী আব্দুল আলীমের কালজয়ী কণ্ঠে অমরত্ব পাওয়া এই গানটিতে নদী ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য জীবনসংগ্রাম মূর্ত হয়েছে। কালবৈশাখীর ঝড়-তুফান, উত্তাল নদীর বুকে নৌকাডুবির শঙ্কা এবং ঘরের প্রিয়জনের আকুল প্রতীক্ষাকে ভাটিয়ালি অঙ্গের সুরের বিস্তারে এক গভীর মানবিক ও আধ্যাত্মিক আর্তিতে রূপ দেওয়া হয়েছে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | কল কল ছল ছল (নদী করে টলমল) |
| মূল ধারা | বাংলা লোকসংগীত (নদীমাতৃক ভাটিয়ালি গান) |
| মূল গীতিকার ও সুরকার | এ কে এম আব্দুল আজীজ |
| ঐতিহাসিক আদি শিল্পী | আব্দুল আলীম |
| উল্লেখিত প্রযোজনা ও কাভার | সঙ্গীত গুরুকুল / স্টুডিও গুরুকুল (শিল্পী: পর্ণা মিটিল্ডা কস্তা) |
| সুর ও রূপ | পূর্ববঙ্গের আবহমান ভাটিয়ালি মেঠো সুর |
| তাল | দাদরা / কাহারবা (বিলম্বিত ও মধ্যম লয়) |
| মূল উপজীব্য | উত্তাল দরিয়ার ভয়াল রূপ, মাঝির নৌযাত্রায় প্রিয়জনের উদ্বেগ, ‘বদর’ গাজীর নামস্মরণ ও কূলে ফিরে আসার আকুল মিনতি |
| প্রধান চিত্রকল্প | টলমল নদী, বিষম দইরা (দরিয়া), পাল ও হাল, বৈঠা, বদর পীর, ভাটি গাঙ, লগি, পথের তালাশ, কূলের একাকীত্ব |
| আবেগীয় আবহ | উৎকণ্ঠা, বুকভাঙা আকুলতা, প্রার্থনা ও নিবিড় অনুরাগ |
কল কল ছল ছল
Kol Kol Chhol Chhol
Kolkol, chholchhol, nodi kore tolmol
Dheu bhange jhor-tufanete
Nao baiyo na majhi bishom doiraate
Tumi nao baiyo na majhi bishom doiraate
Ore gogone gogone hunkaariya chhute megh
Shonshon bayu bohe choudike
Majhi, nimishe gutaiyo pal, samle dhoriyo hal
Dhire dhire dio pari boithate
Nao baiyo na majhi bishom doiraate
Tumi nao baiyo na majhi bishom doiraate
Bodor bodor goli, kinare kinare choli
Bhati gange bhatiyali gaiyo
Thakle joare deri, logi maro toratori
Belabeli ghate phira aiyo
Thaki chahiya chahiya ponther pane talashe
Duruduru kãpe hiya nairashe
More kule raikha barabar na jaiyo gange ar
Sathe sathe nio tule noukate
Nao baiyo na majhi bishom doiraate
Tumi nao baiyo na majhi bishom doiraate
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. নদীর উত্তাল রূপ ও বারণের আর্তি
“কলকল, ছলছল, নদী করে টলমল ঢেউ ভাঙে ঝড়-তুফানেতে / নাও বাইয়ো না মাঝি বিষম দইরাতে…”
গানটির সূচনাই হয় নদীতীরের এক দৃশ্যমান আলোড়ন দিয়ে। নদীর আপাত কলকল ধ্বনি ঝড়ের তোড়ে ভয়াল গর্জনে রূপ নিয়েছে। বিশাল দরিয়ার সেই উত্তাল ঢেউয়ের মুখে মাঝিকে নৌকা ভাসাতে নিষেধ করার মধ্যে প্রকাশিত হয় প্রিয়জনের অপরিসীম উদ্বেগ।
২. প্রকৃতির তাণ্ডব ও মাঝির সতর্কতা
“ওরে গগনে গগনে হুংকারিয়া ছুটে মেঘ, শনশন বায়ু বহে চৌদিকে / মাঝি, নিমেষে গুটাইয়ো পাল, সামলে ধরিয়ো হাল, ধীরে ধীরে দিও পাড়ি বৈঠাতে…”
দুর্যোগের নিখুঁত চিত্রায়ন। আকাশে মেঘের ডাক এবং চারদিকের দমকা হাওয়ায় পালের নৌকার টিকে থাকা অসম্ভব। তাই দ্রুত পাল নামিয়ে শক্ত হাতে হাল ধরে সাবধানে বৈঠা বেয়ে পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞ লোকজ কৌশলটি এখানে বাণীর রূপ নিয়েছে।
৩. পীর-বদর স্মরণ ও ঘাটে ফেরার আকুতি
“বদর বদর বলি, কিনারে কিনারে চলি ভাটি গাঙে ভাটিয়ালি গাইয়ো / থাকলে জোয়ারে দেরি, লগি মারো তড়াতড়ি বেলাবেলি ঘাটে ফিরা আইয়ো…”
বাংলার মাঝিমল্লাদের চিরায়ত লোকবিশ্বাস। নদীর বিপদে মাঝিরা যেমন ‘বদর বদর’ বলে ডাক দেয়, তেমনি কিনার ধরে চলার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বেলা শেষ হওয়ার আগেই যেন লগি ঠেলে দ্রুত ঘাটে ফিরে আসে, কারণ দূরবর্তী ঘাটে কোনো এক ব্যাকুল হৃদয় পথ চেয়ে প্রহর গুনছে।
৪. কূলে একাকীত্বের ভয় ও সহযাত্রার প্রার্থনা
“থাকি চাহিয়া চাহিয়া পন্থের পানে তালাশে, দুরুদুরু কাঁপে হিয়া নৈরাশে / মোরে কূলে রাইখা বারাবার না যাইয়ো গাঙেতে আর, সাথে সাথে নিও তুলে নৌকাতে…”
গানটির সবচেয়ে আবেগঘন উপলব্ধি। ঘাটে একা দাঁড়িয়ে দূর দিগন্তের পানে তাকিয়ে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা করা দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক। সেই নৈরাশ্যের চেয়ে মাঝির নৌকায় আশ্রয় নিয়ে একসাথে তুফানের মুখোমুখি হওয়াও অনেক সহজ।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
গানটিতে নদীর উত্তাল স্রোতে প্রিয়জনকে হারানোর যে শঙ্কা, তা কূলে থাকা মানুষের চোখে এক গভীর আশাহীন দৃষ্টি এনে দেয়। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে যখন আশাহীন নয়ন ঝড়ের বুক চিরে কোনো নৌকার দেখা পায় না, তখন সেই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর সমতুল্য মনে হয়। চিরতরে একা হয়ে যাওয়ার বিদায়-আঘাত এতটাই তীব্র যে, আশাহীন চোখ নদীর পাড়ে একা বেঁচে থাকার চেয়ে মাঝির সাথে উত্তাল ঢেউয়ে বিলীন হওয়াকেই পরম আশ্রয় মনে করে। লৌকিক বিচ্ছেদের ভীতি এখানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সহযাত্রার চরম সংকল্পে রূপান্তরিত হয়েছে।
সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য
আবহমান মেঠো শব্দাবলি: ‘দইরা’ (দরিয়া), ‘বেলাবেলি’, ‘পন্থের পানে তালাশ’, ‘হিয়া’—গ্রামবাংলার নিজস্ব আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারে গানটি মাটির ঘ্রাণে ভরপুর।
লোকবিশ্বাসের প্রতিফলন: মাঝিদের সুরক্ষার জন্য ‘বদর গাজী’ বা ‘পীর বদর’-এর নাম ডাকার প্রাচীন ঐতিহ্যটি এখানে ঐতিহাসিকভাবে স্থান পেয়েছে।
ধ্বনিঝংকার ও অনুকৃতি: ‘কলকল’, ‘ছলছল’, ‘টলমল’, এবং ‘শনশন’—প্রকৃতির রূপ ও বায়ুর গতিকে ধ্বন্যাত্মক শব্দের মাধ্যমে শ্রুতিগোচর করা হয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
ভাটিয়ালির উদাসী সুর: গানটির মূল সুর ভাটিয়ালি অঙ্গের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নদী ও প্রান্তরের বিশালতার সাথে সুরের যে দীর্ঘ টান ও মীড় ব্যবহৃত হয়, তা এক অদ্ভুত শূন্যতা ও হাহাকার জাগিয়ে তোলে।
দাদরা ও কাহারবার দোলা: নদীর ঢেউয়ের ওঠানামার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তালের লয় কখনো বিলম্বিত, আবার সতর্কতার অংশে চঞ্চল দোলায় রূপান্তরিত হয়।
কণ্ঠস্বরের আর্তি: সুরের অবরোহণে যখন “নাও বাইয়ো না মাঝি” শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়, তখন তা কেবল গান থাকে না, এক ব্যাকুল হৃদয়ের কান্নার রূপ নেয়।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
এ কে এম আব্দুল আজীজ: গানটির কথা ও সুরের রূপকার। তিনি বাংলার আবহমান ভাটিয়ালি ও লোকজীবনের নিখাদ উপাদানকে আধুনিক রেকর্ডিংয়ের উপযোগী করে তুলেছিলেন।
আব্দুল আলীম (১৯৩১–১৯৭৪): বাংলা লোকসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট। তাঁর উদাত্ত, ভরাট ও দরদি কণ্ঠ এই গানটিকে বাংলার ঘরে ঘরে অমর করে তুলেছিল।
সমকালীন রূপায়ণ (সঙ্গীত গুরুকুল): ঐতিহ্যবাহী এই গানটি আধুনিক তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ‘সঙ্গীত গুরুকুল’-এর প্রযোজনায় পর্ণা মিটিল্ডা কস্তার কণ্ঠে গানটির একটি সংবেদনশীল কাভার প্রকাশিত হয়েছে, যা নতুন শ্রোতাদের লোকসংগীতের শিকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন লোকসংগীত সংগ্রহশালা।
- বাংলা লোকসংগীত কোষ, আশুতোষ ভট্টাচার্য।
- আব্দুল আলীম স্মারক সংকলন, ঢাকা।
কল কল ছল ছল [ Kolo Kolo Cholo Cholo ] নিয়ে কভার ঃ
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।








![মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা [ Modhu Hoi Hoi Bish Khawaila ] 3 মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/মধু-হই-হই-বিষ-খাওয়াইলা-1024x576.webp)






