সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই আগস্ট ২০২৬, ১:২৬ পিএম

কিছু গান সময়ের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেসব গানে শুধু সুর ও কথা থাকে না; থাকে একটি সময়ের স্বপ্ন, সংগ্রাম, বেদনা এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। অংশুমান রায়ের কণ্ঠে গাওয়া ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ তেমনই একটি গান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে গানটি বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সাংস্কৃতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছিল।
১৯ আগস্ট ১৯৩৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবায় জন্মগ্রহণ করেন অংশুমান রায়। লোকসংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং নিজস্ব কণ্ঠসাধনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সংগীতের জগতে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। জীবনের শুরুতে সরকারি চাকরিতে যুক্ত থাকলেও সংগীতের প্রতি তাঁর টান ক্রমে এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নিরাপদ চাকরিজীবন ছেড়ে তিনি পুরোপুরি সংগীতচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
প্রায় তিন দশকের সংগীতজীবনে তিনি লোকসংগীত, আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের গানসহ বিভিন্ন ধারায় কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর গাওয়া ‘ভাদ্র আশ্বিন মাসে ভ্রমর লাগে কাঁচা বাঁশে’, ‘দাদা পায়ে পড়ি রে, মেলা থেকে বউ এনে দে’সহ বেশ কিছু গান দুই বাংলার শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পায়। তবে তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত সেই ঐতিহাসিক গান।
Table of Contents
‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ গানের কথা লিখেছিলেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। সুরারোপ ও কণ্ঠ দেন অংশুমান রায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় একটি আড্ডায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে কেন্দ্র করে গানটির ভাবনা তৈরি হয়।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের পরিকল্পনার সঙ্গে একটি গান যুক্ত করার কথা ভাবা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার গানটির কথা লিখে দেন। অংশুমান রায় তাতে সুরারোপ করে নিজের কণ্ঠে গানটি পরিবেশন করেন। পরে আকাশবাণী কলকাতার ‘সংবাদ-বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে গানটি প্রচারিত হয়।
এরপর খুব দ্রুত গানটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তের দুই পাশের বাঙালির কাছে এটি হয়ে ওঠে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি চলেছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও। গান, কবিতা, নাটক ও বেতার অনুষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রত্যয়ের আবহ তৈরি করেছিল। সেই সাংস্কৃতিক পরিসরে অংশুমান রায়ের গানটি বিশেষ জায়গা করে নেয়।
গানটির শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হলেও এর পরের অংশে একজন নেতার কণ্ঠকে লক্ষ মানুষের কণ্ঠের সঙ্গে একীভূত করার যে ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে, সেটিই গানটিকে আলাদা তাৎপর্য দেয়। ‘একটি মুজিবর’ থেকে ‘লক্ষ মুজিবর’—এই রূপকল্পের মধ্য দিয়ে মুক্তির আন্দোলনে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের চিত্র ফুটে ওঠে।
পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও গানটির পরিবেশন শোনা যায়। সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বারও গানটি কণ্ঠে ধারণ করেন। ফলে গানটি মুক্তিযুদ্ধের সংগীত-ইতিহাসে আরও বিস্তৃত পরিচিতি লাভ করে।
বাংলাদেশের প্রতি অংশুমান রায়ের টান ছিল গভীর। তাঁর পারিবারিক শিকড়ের একটি অংশ ছিল রাজশাহীতে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল একজন শিল্পীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পারিবারিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যের সম্পর্কও।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গানটির জন্য অংশুমান রায় ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু একই বছরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং সেই সম্মাননা আর প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের সরকার মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ২০১২ সালের ২৭ মার্চ অংশুমান রায়কে মরণোত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। ঢাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর ছেলে, সংগীতশিল্পী ভাস্কর রায়।
১৯৯০ সালের ২২ এপ্রিল অংশুমান রায় প্রয়াত হন। তাঁর জীবনাবসানের পরও তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা গানটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে টিকে আছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও স্মরণপর্বে গানটির উপস্থিতি এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নতুন করে সামনে আনে।
অংশুমান রায়ের শিল্পীসত্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এই জায়গাতেই—তিনি এমন একটি সময়ে গান গেয়েছিলেন, যখন একটি গানও মানুষের মনোবল বাড়ানোর শক্তি হয়ে উঠতে পারত। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দগুলো কেবল শ্রুতিমধুর সুরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা পৌঁছে গিয়েছিল একটি জাতির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার কেন্দ্রে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একজন শিল্পী হয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি যে জায়গা করে নিয়েছেন, তা দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর গান দেখিয়েছে, ভৌগোলিক সীমারেখা থাকলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় সেই সীমা অতিক্রম করে যায়।
১৯ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন স্মরণ করা নয়; একই সঙ্গে স্মরণ করা মুক্তিযুদ্ধের সেই সাংস্কৃতিক সময়কে, যখন গান হয়ে উঠেছিল মানুষের সাহস, প্রত্যয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বাহক।
অংশুমান রায়ের কণ্ঠ আজ স্তব্ধ। কিন্তু তাঁর গাওয়া সেই গান এখনো বহন করে একাত্তরের স্মৃতি। একটি কণ্ঠ থেকে লক্ষ কণ্ঠের যে প্রতিধ্বনির কথা তিনি গেয়েছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সেই প্রতিধ্বনি আজও অমলিন।
অংশুমান রায় তাই শুধু একজন শিল্পীর নাম নন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গান, দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এক স্মরণীয় কণ্ঠের নাম। তাঁর জন্মদিনে সেই শিল্পীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, যাঁর কণ্ঠে একদিন বাংলাদেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সুর পেয়েছিল।
মন্তব্য