সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ৯:২৯ পিএম

বলিউডের থ্রিলার ও রোমান্টিক ঘরানার চলচ্চিত্রে ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আওয়ারাপন’ এক অনন্য মানদণ্ড তৈরি করেছিল। ছবিটির আবেগঘন গল্প ও নজরকাড়া অভিনয়ের পাশাপাশি এর সঙ্গীত মানুষকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর এই জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির সিক্যুয়াল ‘আওয়ারাপান ২’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সিনেমাটির গান নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম কিস্তির কালজয়ী সুরের বিশাল ঐতিহ্য বজায় রেখে নতুন দিনের দর্শকদের জন্য একেবারে আলাদা কিছু তৈরি করা ছিল পুরো সঙ্গীত টিমের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই জন্ম নেয় এক নতুন অভিজ্ঞতা ও সুরের রসায়ন।
ছবিটির অন্যতম আলোচিত গান ‘পিয়া ঘর আয়া – হোমকামিং’ নির্মাণের পেছনে রয়েছে এক বিশেষ গল্প। গানটি তৈরির জন্য অন্য কারো মাধ্যমে নয়, বরং সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী আখিল সাচদেবাকে সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেছিলেন খোদ সিনেমার মূল নায়ক ইমরান হাশমি। সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদনমূলক সংবাদ সংস্থা আইএএনএস-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সেই পেছনের অজানা গল্প এবং গানটি ঘিরে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনা প্রকাশ করেছেন আখিল নিজেই।
আখিল সাচদেবা জানান, বলিউড তারকা ইমরান হাশমির কাছ থেকে হুট করে সরাসরি ফোন পাওয়াটা তার জন্য বেশ রোমাঞ্চকর ও চমকপ্রদ ছিল। ফোনালাপে ইমরান তাকে জানান, আখিল সচরাচর যে ধরনের প্রথাগত প্রেমানুভূতির গান কিংবা হৃদয়ভাঙা বিরহের সুর তৈরি করেন, এবার তাকে সেই পরিচিত গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। ইমরান তাকে একদম নতুন ঘরানার একটি আবহ তৈরির অনুরোধ জানান। শুধু কাজ পাওয়ার বিষয় নয়, গানটি বাঁধার ক্ষেত্রে আখিলকে শতভাগ সৃজনশীল স্বাধীনতাও দেন তিনি। ইমরান তাকে স্পষ্টভাবে বলেন, কোনোপ্রকার বাজারের বাণিজ্যিক চাপ না নিয়ে তার নিজের মন বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যা সায় দেয়, সেই গভীর অনুভূতি থেকেই যেন গানটির সুর ও কথা সাজানো হয়।
২০০৭ সালের মূল ‘আওয়ারাপন’ সিনেমায় প্রীতমের সুরে মোস্তফা জাহিদের গাওয়া ‘তেরা মেরা রিশতা’ এবং ‘তো ফির আও’-এর মতো ট্র্যাকগুলো আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে রাজত্ব করছে। হিন্দি সিনেমার সঙ্গীতের ইতিহাসে এগুলোর অবস্থান অনেক উঁচুতে। স্বাভাবিকভাবেই সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে একই স্তরের সৃষ্টি তুলে ধরা আখিলের ওপর মানসিকভাবে একটা ইতিবাচক চাপ তৈরি করেছিল। তবে নিজের মনের সুপ্ত অনুভূতি ও সঙ্গীতজ্ঞানের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তিনি একটি নতুন পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্ববর্তী সিনেমার গানের ধারায় যা ছিল না, এবার তিনি সাহসিকতার সাথে গানের মূল কথায় কিছু পাঞ্জাবি শব্দ ও লোকজ ভাষার টান যুক্ত করেন।
তবে এই নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। গানটি প্রকাশের পরপরই লিরিক্সে পাঞ্জাবি শব্দ ব্যবহারের কারণে মারাত্মক কটাক্ষ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় আখিলকে। হিন্দি সিনেমার ক্ল্যাসিক সুরের সাথে পাঞ্জাবি লিরিক্সের সংমিশ্রণ শ্রোতাদের একটি বড় অংশ শুরুতে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। এমনকি নেটদুনিয়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে তীব্র কটু কথা ও গালাগাল পর্যন্ত শুনতে হয়েছিল। এই ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও আখিল ভেঙে পড়েননি। তিনি মনে মনে নিশ্চিত ছিলেন যে, মানুষ যখন প্রেক্ষাগৃহে বড় পর্দায় সিনেমার গল্প এবং দৃশ্যায়নের সাথে গানটি শুনবে ও দেখবে, তখন তাদের এই ভুল ধারণা মুহূর্তেই কেটে যাবে।
অবশেষে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তির পর সুরকারের সেই গভীর আত্মবিশ্বাসই শতভাগ সত্যি প্রমাণিত হয়। ছবির গল্পের মূল আবহের সাথে প্রেক্ষাগৃহে যখন গানটি বাজতে শুরু করে, তখন মুহূর্তের মধ্যেই দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৮০ ডিগ্রি বদলে যায়। পর্দায় দৃশ্যপট ও গানের ভাবাবেগ দেখে শ্রোতারা উপলব্ধি করতে পারেন কেন আখিল এই শব্দগুলো বেছে নিয়েছিলেন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যেসব নেটিজেন ও শ্রোতা গানটি মুক্তির প্রথম দিকে কমেন্ট বক্সে সুরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, তারাই পরবর্তীতে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে পরিবর্তন আনেন। অনেক অনুরাগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে আখিল সাচদেবা-কে ব্যক্তিগতভাবে বার্তা বা ডিরেক্ট মেসেজ (DM) পাঠিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তারা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে, প্রেক্ষাগৃহে পুরো সিনেমার মূল কাহিনীর প্রেক্ষাপটে গানটির আবেদন ও দৃশ্যায়ন দুর্দান্ত লেগেছে এবং শুরুতে তারা না বুঝেই সমালোচনা করেছিলেন।
প্রথম পর্বের সাড়াজাগানো ক্লাসিক গানগুলোর নিজস্ব এক আলাদা মর্যাদা রয়েছে, যা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু ‘আওয়ারাপন ২’-এর নতুন তৈরি হওয়া সবগুলো গানের মধ্যে আখিল সাচদেবার ‘পিয়া ঘর আয়া – হোমকামিং’ গানটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও ট্রেন্ডিং তালিকায় শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে। কোনো কৃত্রিম চাপ না নিয়ে একদম নিজের ভেতরের তাড়না থেকে কাজ করলে যে তা শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করতে পারে, এই গানটি যেন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য