সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২২, ৬:৪৬ পিএম

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার আনন্দ ও আবহকে এক চমৎকার সাঙ্গীতিক রূপ দিয়েছে ‘গৌরী এলো’ গানটি। এই উৎসবমুখর গানটি গেয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের দুই অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান সহোদরা অন্তরা নন্দী এবং অঙ্কিতা নন্দী, যারা শ্রোতামহলে ‘নন্দী সিস্টার্স’ নামে সমধিক পরিচিত। গানটির মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও লোকায়ত আগমনী গানের ওপর। আধুনিক ও চটুল সংগীতায়োজনের মাধ্যমে গানটিকে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই গানটির সৃষ্টির প্রেক্ষাপট মূলত লোকবাংলার এক চিরন্তন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুভূতির সাথে যুক্ত। শাস্ত্রীয় মতে দেবী দুর্গা বা গৌরী মর্ত্যলোকে আসেন মহিষাসুর বধের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। তবে বাঙালি লোকসংস্কৃতিতে এই আগমনকে দেখা হয় ঘরের মেয়ের বাপের বাড়ি আসার আনন্দ হিসেবে। শরৎকালে আশ্বিন মাসে কন্যা গৌরী তাঁর চার সন্তান—কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে নিয়ে মা-বাবার কাছে আসেন, আর এই আনন্দকে কেন্দ্র করেই গানটি রচিত। গ্রামীণ কথ্য ভাষা, কৌতুক রস এবং উৎসবের ঢাকের আওয়াজকে এক সুতোয় বেঁধে গানটি উৎসবের মৌসুমে এক অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার করে।
Table of Contents
বলদে চড়িয়া শিবে শিঙ্গায় দিলা হাঁক
আর শিঙ্গা শুনি মর্ত্যেতে বাজিয়া উঠল ঢাক।
শিবের সনে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী
আশ্বিন মাসে বাপের বাড়ি আসে ভগবতী।
বলো গৌরী এলো, দেখে যা লো
গৌরী এলো, দেখে যা লো
ভবেরও ভবানী আমার ভবন করিল আলো।
গৌরী এলো, দেখে যা লো।
দেখো সিংহের উপর উইঠ্যা ছুঁড়ি
আরে সিংহের উপর উইঠ্যা ছুঁড়ি, অসুরের টিক্কি ধরি
গলায় দিছে সাপ জড়াইয়া, বুকে মারছে খোঁচা
কী দুগ্গী দেখলাম চাচা, কী ঠাকুর দেখলাম চাচী।
ঐ যে এক তুম্বা বদন, দাঁত দুইডা তার মূলার মতন
কান দুইডা তার কুলার মতন, মাথা লেপা-পোঁছা
কী ঠাকুর দেখলাম চাচা, কী দুগ্গী দেখলাম চাচী।
গৌরী এলো, দেখে যা লো
ভবেরও ভবানী আমার ভবন করিল আলো।
গৌরী এলো, দেখে যা লো।
আছে ডাইনে বাঁয়ে দুইডা ছেমড়ি, পইরা আছে ঢাকাই শাড়ি
ঘুরতে দেখছি বাড়ি বাড়ি, ফ্যাশন দেখায় ভারী।
আবার ময়ূরের পরে বসেন যিনি, এনার বড় চিকচিকানি
ধুতি করছে কোঁচা
কী ঠাকুর দেখলাম चाचा, কী দুগ্গী দেখলাম চাচী।
গৌরী এলো, দেখে যা লো
ভবেরও ভবানী আমার ভবন করিল আলো।
গৌরী এলো, দেখে যা লো।
সপ্তমীতে মা জননী মণ্ডপে মণ্ডপে
অষ্টমীতে মা জননী ফুলে ফলে ধূপে
নবমীতে মা জননী নিশি পোহাইলা
দশমীতে পাগলা ভোলা নাচিতে লাগিলা।
শিবে দুর্গারে লইয়া যাবে কৈলাস ভবন
আর বিসর্জনের বাজনা বাজে বিজয়া গমন
জয় জয় বিজয়া গমন।
হে, আইল আমার ভোলানাথ রে
আইল আমার কাশীনাথ, আইল আমার তিন্নাথ
আইল আমার ভোলানাথ রে, আইল আমার ভোলানাথ রে।
ভোলানাথের শিঙ্গায় বলে বম বম, বম বম, দিদি দিম, দিম, দিম, দিম।
Bolode choriya Shibe shingay dila hank
Ar shinga shuni mortete bajiya uthlo dhak.
Shiber sone Kartik, Gonesh, Lakkhi, Saraswati
Ashwin mase baper bari ase Bhogoboti.
Bolo Gouri elo, dekhe ja lo
Gouri elo, dekhe ja lo
Bhobero Bhobani amar bhobon korilo alo.
Gouri elo, dekhe ja lo.
Dekho singher upor uithya chhuri
Are singher upor uithya chhuri, oshurer tikki dhori
Golay dice sap joraiya, buke marce khoncha
Ki Duggi dekhlam chacha, ki Thakur dekhlam chachi.
Oi je ek tumba bodon, dant duida tar mular moton
Kan duida tar kular moton, matha lepa-pocha
Ki Thakur dekhlam chacha, ki Duggi dekhlam chachi.
Gouri elo, dekhe ja lo
Bhobero Bhobani amar bhobon korilo alo.
Gouri elo, dekhe ja lo.
Ache daine baye duida chhemri, poira ache dhakai shari
Ghurte dekhsi bari bari, fashion dekhay bhari.
Abar moyurer pore bosen jhini, enar boro chikchikani
Dhuti korce koncha
Ki Thakur dekhlam chacha, ki Duggi dekhlam chachi.
Gouri elo, dekhe ja lo
Bhobero Bhobani amar bhobon korilo alo.
Gouri elo, dekhe ja lo.
Soptomite ma jononi mondope mondope
Ostomite ma jononi fule fole dhupe
Nobomite ma jononi nishi pohaila
Doshomite pagla Bhola nacite lagila.
Shibe Durgare loiya jabe Koilas bhobon
Ar bisorjoner bajna baje bijoya gomon
Joy joy bijoya gomon.
He, ail amar Bholanath re
Ail amar Kashinath, ail amar Tinnath
Ail amar Bholanath re, ail amar Bholanath re.
Bholanather shingay bole bom bom, bom bom, didi dim, dim, dim, dim.
গানটির সুরের ধরন মূলত খাঁটি বাংলার লোকসংগীত এবং উৎসবের চটুল তালের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি ঐতিহ্যবাহী আগমনী গানের একটি আধুনিক ও দ্রুত লয়ের সংস্করণ। সুরের সাথে ঐতিহ্যবাহী ঢাকের আওয়াজ, কাঁসর ঘণ্টা এবং আধুনিক ড্রামস ও পারকাশনের ফিউশন গানটিতে একটি উৎসবমুখর দোলা তৈরি করে, যা যেকোনো শ্রোতাকে নাচের ছন্দে মেতে উঠতে বাধ্য করে।
গানের মূল ভাব গড়ে উঠেছে আগমনী ও বিজয়া দশমীর মিশ্র অনুভূতি এবং দেবী দুর্গার পুরো পরিবারের প্রতি গ্রামীণ মানুষের সরল দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। এখানে দেব-দেবীকে কোনো দূরের অলৌকিক সত্তা হিসেবে না দেখে, ঘরের অতি পরিচিত মানুষ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। গণেশের স্থূলকায় রূপ, কার্তিকের জাঁকজমকপূর্ণ সাজ আর দুই কন্যা লক্ষ্মী-সরস্বতীর ঢাকাই শাড়ি পরার বর্ণনা অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ ও ঘরোয়া ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার শেষাংশে সপ্তমীর আনন্দ থেকে শুরু করে দশমীর বিসর্জনের যে করুণ সুর ও কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বেদনা, তা-ও সমানভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো অন্তরা ও অঙ্কিতা নন্দীর গায়কীর নিখুঁত সমন্বয় এবং কণ্ঠের উচ্চ গতিশীলতা। গানের গতি অত্যন্ত দ্রুত হলেও দুই বোনের উচ্চারণ এবং তালের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল দেখার মতো। গানের মাঝে গ্রামীণ লোকজ শব্দ যেমন ‘ছেমড়ি’, ‘ছুঁড়ি’, ‘উইঠ্যা’ ইত্যাদির ব্যবহার গানটিকে মাটির কাছাকাছি রেখেছে। উৎসবের আমেজ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত ব্যাকগ্রাউন্ড কণ্ঠ এবং বাদ্যযন্ত্রের সমাহার এই গানটিকে পূজার মণ্ডপগুলোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের তথ্যসমূহ বাংলার ঐতিহ্যবাহী আগমনী গান ও লোকসাহিত্য সংকলন, অন্তরা ও অঙ্কিতা নন্দীর অফিশিয়াল ডিসকোগ্রাফি এবং সনাতন ধর্মীয় উৎসবের প্রামাণ্য আচার-উৎস থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য