সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই আগস্ট ২০২৬, ৬:১ পিএম

আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে বড় মঞ্চ, হাজারো দর্শক এবং চোখধাঁধানো আয়োজন—এসব একনের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নতুন কিছু নয়। কিন্তু মাত্র তিনজন শ্রোতার সামনে গান গেয়ে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক পাওয়ার অভিজ্ঞতা যে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটি, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আরও বিস্ময়কর ছিল আয়োজনের ব্যাপ্তি। বিশাল মঞ্চ, এলইডি আলো, লেজার, পূর্ণাঙ্গ পরিবেশনা দল এবং বিলাসবহুল বিশেষ উড়োজাহাজ—সবই ছিল কয়েকজন মানুষের একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের জন্য।
সম্প্রতি ‘ফ্ল্যাগর্যান্ট’ পডকাস্টে নিজের ক্যারিয়ারের এই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা জানান সেনেগালিজ-আমেরিকান সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও প্রযোজক একন। ২০২৬ সালের ১০ জুন প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া এক অস্বাভাবিক ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের বর্ণনা দেন। অনুষ্ঠানের পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি প্রায় এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার পেয়েছিলেন বলে জানান। সাক্ষাৎকারের আলোচনায় এটি তাঁর উল্লেখ করা ‘পাগলাটে’ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পরিবেশনাগুলোর একটি হিসেবে উঠে আসে।
একনের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত ধনী একটি পরিবার। পরিবারের এক মেয়ে তাঁর বড় ভক্ত ছিলেন। প্রিয় শিল্পীকে সামনে থেকে গান শোনানোর ইচ্ছা থেকেই এত বড় আয়োজন করা হয়। তবে শুরুতে একনকে জানানো হয়নি যে অনুষ্ঠানে শ্রোতার সংখ্যা এত কম হবে।
বরং প্রস্তুতি দেখে তাঁর ধারণা হয়েছিল, সেখানে বড় ধরনের অতিথি সমাগম হতে যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে পাঠানো হয়েছিল প্রায় পুরো ট্যুরিং দল। মঞ্চের শব্দব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মীরাও প্রস্তুত ছিলেন। এত বড় আয়োজন দেখে কয়েকজন দর্শকের কথা ভাবার কোনো কারণই ছিল না।
যাত্রার ব্যবস্থাপনাও ছিল একই রকম বিলাসবহুল। একনকে অনুষ্ঠানে নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল বিশেষভাবে সাজানো একটি বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ। তাঁর বর্ণনায়, উড়োজাহাজটিতে ছিল শোবার ঘর, গোসলের ব্যবস্থা, খেলাধুলার জায়গা এবং চলচ্চিত্র দেখার আলাদা সুবিধা। অর্থাৎ যাত্রাপথের ব্যবস্থাপনাও ছিল সাধারণ কোনো ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।
কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে একনের সামনে যে দৃশ্য আসে, তা তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মেলেনি।
বড় একটি হলঘর পেরিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মঞ্চের সামনে। সেখানে পেশাদার কনসার্টের মতো বিশাল মঞ্চ, এলইডি আলো, লেজার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত আয়োজন প্রস্তুত ছিল। অথচ দর্শকদের জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র তিনটি চেয়ার।
কিছুক্ষণ পর উপস্থিত হন পরিবারের তিন সদস্য—একজন মেয়ে, একজন ছেলে এবং তাঁদের মা। অর্থাৎ বিপুল প্রস্তুতি, বিশাল মঞ্চ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত আয়োজনের সামনে একনের শ্রোতা ছিলেন মাত্র তিনজন।
এরপর শুরু হয় পরিবেশনা। একন তাঁর জনপ্রিয় গান পরিবেশন করতে থাকেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাঝপথে পরিবারের মেয়েটি তাঁকে থামিয়ে বিশেষ একটি অনুরোধ করেন। তিনি শুনতে চেয়েছিলেন একনের সবচেয়ে পরিচিত গানগুলোর একটি ‘মিস্টার লোনলি’।
গানটি গাওয়ার পর একনের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও অদ্ভুত পরিস্থিতি। মেয়েটি আবারও একই গান গাওয়ার অনুরোধ করেন। একবার নয়, বারবার। শেষ পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাঁকে একই গান পরিবেশন করতে হয় বলে জানান একন। তিনি ঘটনাটিকে রসিকতার সঙ্গে তুলনা করেন এমন এক পরিস্থিতির সঙ্গে, যেখানে একটি গান শেষ হলেই আবার একই গান চালু করতে বলা হচ্ছে। ঘটনাটির বিবরণ সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এই ঘটনার আর্থিক দিকটিও ছিল বিস্ময়কর। একনের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু তাঁর পারিশ্রমিকই ছিল প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার। এর বাইরে মঞ্চ, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, পরিবহন এবং অন্যান্য আয়োজন মিলিয়ে পুরো অনুষ্ঠানের ব্যয় প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে ১০ লাখ মার্কিন ডলার ১২ কোটিরও বেশি টাকা, যদিও বিনিময় হার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৃত অঙ্ক ওঠানামা করতে পারে। আর মোট ৫০ লাখ ডলারের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ মাত্র তিনজনের ব্যক্তিগত বিনোদনের জন্য কয়েক কোটি টাকার বেশি পারিশ্রমিক এবং বিপুল অঙ্কের আনুষঙ্গিক ব্যয় হয়েছিল।
ঘটনাটি স্মরণ করে একন নিজেও হাস্যরস করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, শুরুতেই যদি তাঁকে জানানো হতো যে অনুষ্ঠানে মাত্র তিনজন মানুষ থাকবেন, তাহলে এত বড় আয়োজনের প্রয়োজন হতো না। এমনকি তিনি রসিকতা করে বোঝান, পরিবারের বসার ঘরেই গিয়ে এক ঘণ্টা গান গেয়ে আসা সম্ভব ছিল—এত বিশাল মঞ্চ ও কনসার্ট অবকাঠামোর দরকার পড়ত না।
তবে একনের জন্য এমন বিপুল পারিশ্রমিকের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০২৫ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণ একটি পরিবেশনার জন্য তিনি সর্বোচ্চ প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক পেতে পারেন এবং ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানগুলোর পারিশ্রমিক আরও বেশি হতে পারে।
একনের সংগীতজীবনের উত্থানের পেছনে ‘মিস্টার লোনলি’ গানটির গুরুত্বও আলাদা। তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘ট্রাবল’ ২০০৪ সালে প্রকাশের পর ‘লোনলি’ তাঁকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে দ্রুত পরিচিত করে তোলে। গানটি মূলত ববি ভিনটনের ১৯৬৪ সালের জনপ্রিয় ‘মিস্টার লোনলি’ গানের অংশ ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল। একনের সংস্করণে পুরোনো গানের নমুনার সঙ্গে আধুনিক ছন্দ ও নিজস্ব পরিবেশনা যুক্ত হয়ে গানটি নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
পরবর্তী সময়ে ‘লকড আপ’, ‘স্ম্যাক দ্যাট’, ‘আই ওয়ানা লাভ ইউ’, ‘ডোন্ট ম্যাটার’, ‘বিউটিফুল’ ও ‘রাইট নাউ’-এর মতো গান একনের আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্ত করে। গায়ক হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি তিনি গীতিকার, প্রযোজক এবং সংগীত ব্যবসার সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত।
তবে বিশ্বজুড়ে লাখো শ্রোতার সামনে গান গাওয়া শিল্পীর জন্য তিনজনের একটি ব্যক্তিগত আসর নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তার ওপর সেই তিনজনের জন্য বিশাল কনসার্টের আয়োজন এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একই গান গেয়ে যাওয়া—ঘটনাটিকে একনের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম বিচিত্র স্মৃতিতে পরিণত করেছে। আর সেই এক ঘণ্টার পরিবেশনার বিনিময়ে প্রায় ১০ লাখ ডলারের পারিশ্রমিক পাওয়ার গল্পটি এখন তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অদ্ভুত কনসার্টের ঘটনাগুলোর একটি।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য