বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণালি যুগের অন্যতম অবিসংবাদিত ও প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও গীতিকার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের আজ শুভ জন্মবার্ষিকী। তিনি তাঁর অসাধারণ সুরের মূর্ছনা এবং অনন্য গায়কী শৈলী দিয়ে বাংলা সংগীতের জগতকে এক অতুলনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
Table of Contents
জন্ম, বংশপরিচয় ও সাঙ্গীতিক পরিবেশ
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯২৩ সালের ৭ জুন ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে এক সমাদৃত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায়ের পেশাগত দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্রের কারণে পরিবারটি তখন লখনউতে বসবাস করত। তবে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ অতিবাহিত হয় পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়ায়। হুগলির সেই ঐতিহ্যবাহী এবং নিবিড় সাংস্কৃতিক আবহেই তাঁর প্রথাগত শিক্ষার বিকাশ ঘটে এবং সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগের ভিত গড়ে ওঠে।
সংগীতের ধারাটি মূলত তাঁর রক্তে এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের মাঝেই সুপ্ত ছিল। তাঁর ঠাকুরদা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন একাধারে একজন দক্ষ বেহালাবাদক এবং তাঁর পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায়ও নিয়মিত সংগীতচর্চা করতেন। শৈশব থেকেই এই সাঙ্গীতিক পরিবেশের মধ্যে লালিত-পালিত হওয়ার ফলে তিনি খুব অল্প বয়সেই শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি নিদারুণভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি প্রথাগত নিয়মে ধ্রুপদ, ধামার, টপ্পা এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও সাধনার মাধ্যমে নিজের সুরের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ ও পরিপক্ব করে তোলেন।
উচ্চশিক্ষা ত্যাগ ও সংগীতকে পেশা হিসেবে বরণ
উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় একসময় কলকাতায় আগমন করেন। তবে পুঁথিগত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যার্জনের চেয়ে সুরের অমিয় বাণী তাঁকে বেশি আকর্ষণ করত। ফলশ্রুতিতে, শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি সংগীত সাধনাকেই নিজের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও ব্রত হিসেবে বেছে নেন। সুরের এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ চিন্ময় লাহিড়ীর নিকট থেকে সংগীতের দীক্ষা ও নিবিড় তালিম গ্রহণ করেন, যা তাঁর সংগীতজীবনকে এক স্বতন্ত্র ও স্থায়ী পরিচিতি দান করে। জীবিকানির্বাহের জন্য তিনি পরবর্তীতে অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের কার্যালয়ে (এজি বেঙ্গল) চাকরিতে যোগদান করলেও তাঁর মূল সুখ্যাতি ও অনুরাগ বজায় ছিল সুর ও সংগীতের বিশাল ভুবনেই।
জীবন ও কর্মের মূল আলেখ্য
কিংবদন্তি এই মহান শিল্পীর জীবনপঞ্জি এবং তাঁর সংগীত সাধনার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| মূল বিষয়বস্তু | ঘটনার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণ |
| জন্ম ও জন্মস্থান | ৭ জুন, ১৯২৩ সাল; লখনউ শহর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। |
| পৈর্তৃক এবং শৈশবের বাসস্থান | চুঁচুড়া, হুগলি জেলা, পশ্চিমবঙ্গ। |
| পারিবারিক ঐতিহ্য | পিতা ও ঠাকুরদার যৌথ সংগীতময় পারিবারিক আবহ। |
| সংগীতের দীক্ষাগুরু | প্রখ্যাত সংগীতবিশারদ ও পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী। |
| পেশাগত কর্মজীবন | অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের কার্যালয় (এজি বেঙ্গল)। |
| সংগীতের মূল ঘরানা | আধুনিক বাংলা গান, ঐতিহ্যবাহী নজরুলসংগীত ও বাংলা গজল। |
| দাম্পত্য জীবন | প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী উৎপলা সেন (বিবাহের সন: ১৯৬৮)। |
| মহাপ্রয়াণের তারিখ | ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৯২ সাল। |
সংগীতে অমর অবদান ও কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ
আধুনিক বাংলা গানকে আমজনতার হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নজরুলসংগীত এবং বাংলা গজলের প্রসারে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের অবদান অত্যন্ত অনস্বীকার্য। তাঁর গায়কীতে ছিল এক মায়াবী কোমলতা, নিখাদ আবেগ এবং রোমান্টিক মাধুর্য, যা শ্রোতাদের অন্তরে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করত। তাঁর সুরারোপিত এবং কণ্ঠ নিঃসৃত গানগুলো বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক অমূল্য চিরস্থায়ী সম্পদের রূপ ধারণ করেছে।
তাঁর সৃষ্ট অসংখ্য জনপ্রিয় এবং অমর গানের তালিকা থেকে নির্বাচিত কিছু কালজয়ী সৃষ্টি নিচে উল্লেখ করা হলো:
“আজও তো এলো না সে”
“আকাশ এত মেঘলা”
“জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো”
“মরমিয়া তুমি চলে গেলে”
“পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম”
“ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না”
“জানি একদিন”
“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি”
“কত না হাজার ফুল”
“হায় বরষা”
ব্যক্তিগত জীবন, জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কেবল পেশাগতভাবেই নন, ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন সুরের প্রতি একনিষ্ঠভাবে নিবেদিতপ্রাণ। ১৯৬৮ সালে তিনি তদানীন্তন সময়ের আরেক প্রথিতযশা ও নন্দিত সংগীতশিল্পী উৎপলা সেনের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এই প্রতিভাবান ও রুচিশীল শিল্পী-দম্পতি আজও এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
দীর্ঘ সংগীত সাধনা শেষে ১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই মহান সুরসাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। পার্থিব জগত থেকে তাঁর প্রস্থান ঘটলেও তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর কালজয়ী সুর এবং জাদুকরী কণ্ঠের মাধ্যমে অসংখ্য সংগীতপ্রেমী মানুষের মনের মণিকোঠায় গভীর শ্রদ্ধার সাথে বেঁচে আছেন। তাঁর জন্মলগ্নে এই মহান সুরশিল্পীর স্মৃতির প্রতি নিবেদন করি আমাদের বিনম্র ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
