আঙুরবালা দেবী । ভারতীয় বাঙালি কণ্ঠশিল্পী ও মঞ্চাভিনেত্রী

আঙুরবালা দেবী (জন্ম: ১৮৯৬/১৯০০ – মৃত্যু: ৭ জানুয়ারি ১৯৮৪) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের বাংলা সঙ্গীত, মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্র জগতের এক অমর নক্ষত্র। তাঁর মধুর, সুরেলা ও সুনিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে বাংলা, হিন্দি, উর্দু গানের পাশাপাশি নজরুলগীতির অথেনটিক রূপ প্রতিষ্ঠায় অসাধারণ অবদান রয়েছে। সমসাময়িককালে তাঁকে ‘বাংলার বুলবুল’, ‘কলকাত্তা কি কোয়েল’ এবং ‘সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী’ বলে অভিহিত করা হতো। ইন্দুবালা দেবী ও কমলা ঝরিয়ার সঙ্গে তাঁকে ‘তিন কন্যা’ (Teen Kanya) হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যাঁরা বাংলা গানের প্রথম দিকের নারী স্টার ছিলেন। তাঁদের নিয়ে ১৯৭২ সালে একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়। তাঁর ক্যারিয়ারে আনুমানিক ৫০০-এরও বেশি রেকর্ড (যার মধ্যে প্রায় ৫০টি নজরুলগীতি) এবং অসংখ্য মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় তাঁকে যুগের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী করে তোলে।

আঙুরবালা দেবী
আঙুরবালা দেবী

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

আঙুরবালা দেবীর পিতৃদত্ত নাম ছিল প্রভাবতী দেবী (কিছু উৎসে প্রভাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়)। জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে—কিছু উৎসে ১৮৯৬ সালের জুলাই মাস (শ্রাবণ মাসের সপ্তমী তিথি), আবার কিছুতে ১৯০০ সালের ১৯ আগস্ট বা ২৩ জুলাই। জন্মস্থান কলকাতার কাশিপুর অঞ্চল বলে উল্লেখ রয়েছে, তবে পৈতৃক নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার ইন্দাস গ্রামে। পিতা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (কিছু উৎসে বিজলীভূষণ ব্যানার্জী) ছিলেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। দারিদ্র্যের কারণে শৈশবেই স্কুলের লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয়, যদিও স্কুলে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে ছাত্রিবৃত্তি লাভ করেছিলেন।

শৈশব থেকেই তাঁর সুরেলা কণ্ঠের পরিচয় পাওয়া যায়। ছোটবেলায় তাঁর ললিতকাকা (ললিত মোহন গোস্বামী, নৃত্যশিক্ষক) তাঁকে স্টার থিয়েটারে নিয়ে যান, যাতে পরিবারের আর্থিক সাহায্য হয়। সেখানেই তাঁর নাম রাখা হয় আঙুরবালা—কারণ তাঁর কণ্ঠ ছিল আঙুরের মতো মিষ্টি। এই নামই তাঁর সারা জীবনের পরিচয় হয়ে ওঠে।

আঙুরবালা দেবী
আঙুরবালা দেবী

সঙ্গীতশিক্ষা ও প্রথম পদক্ষেপ

সাত বছর বয়সে পিতৃবন্ধু অমূল্য মজুমদারের কাছে গানের দীক্ষা নেন। পরবর্তীকালে খেয়াল, ঠুংরি, দাদরা ও গজলে বিভিন্ন গুণী ওস্তাদের কাছে তালিম নেন। উল্লেখযোগ্য গুরু:

  • জিৎপ্রসাদ ও রামপ্রসাদ মিত্র
  • ঈষাণ ঠাকুর (কীর্তন)
  • জমীরুদ্দিন খাঁ (গজল ও দাদরা)
  • কাজী নজরুল ইসলাম (নজরুলগীতি)

কিশোরী বয়সেই HMV গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ডিং শুরু করেন। প্রথম রেকর্ড (প্রায় ১৯১০-এর দশকের শেষভাগে): ‘বাঁধ না তরীখানি আমার এ নদীকূলে’ এবং ‘কালা তোর তারে কদমতলায় চেয়ে থাকি’ (রেকর্ড নং P 4721)। এই দুটি গানই তাঁর প্রথম রেকর্ড হিসেবে অতর্কিত গাওয়া হয় এবং চিরকালের জন্য রেকর্ড হয়ে যায়।

আঙুরবালা দেবী
আঙুরবালা দেবী

সঙ্গীতজীবন ও অবদান

আঙুরবালা দেবী বাংলা, হিন্দি, উর্দু গানে অজস্র কণ্ঠদান করেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজা-মহারাজার দরবারে মেহফিলে গান গেয়ে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। কলকাতা বেতার কেন্দ্রের প্রথম দিনের প্রথম শিল্পী ছিলেন তিনি। HMV থেকে গোল্ড ডিস্ক লাভ করেন।

নজরুলগীতিতে তাঁর অবদান অতুলনীয়। কাজী নজরুল ইসলামের সরাসরি শিক্ষায় তিনি নজরুলগীতির প্রামাণ্য কণ্ঠশিল্পী হয়ে ওঠেন। তাঁর গাওয়া গানগুলো আজও নজরুল সঙ্গীতের অথেনটিসিটির মাপকাঠি। কিছু উল্লেখযোগ্য নজরুলগীতি:

  • ভুলি কেমনে আজো যে মন
  • জমুনে এই কি তুমি সেই জমুনে
  • কুসুমের মালা শুকায়ে গিয়াছে
  • তোমার বুকের ফুলদানিতে
  • মন মানা না
  • কে দিলো খোঁপায় দুতরা ফুল
  • বিদায়সন্ধ্যা আসিলো ওই
  • এত জল ও-কাজল চোখ

অন্যান্য বিখ্যাত গানের মধ্যে রয়েছে ‘আমার জাবার সময়’ (নজরুল), ‘জানি যদি কথা’ ইত্যাদি। তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় ৩০০-এরও বেশি HMV-তে রেকর্ড হয়েছে।

আঙুরবালা দেবীর এ্যালবাম

মঞ্চাভিনয় ও চলচ্চিত্রজীবন

সঙ্গীতের পাশাপাশি অসাধারণ অভিনেত্রী ছিলেন। আট বছর বয়সে নৃপেন্দ্রচন্দ্র বসুর নির্দেশনায় ছোট ছোট নৃত্য-গানের ভূমিকায় মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। ১৯১২ সালে কর্নওয়ালিস থিয়েটারে ‘মুক্তার মুক্তি’ নাটকে গানের ভূমিকায় অভিনয় করে থিয়েটারকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নাট্যকার মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গানের মাধ্যমে নাটককে জনপ্রিয় করার পরিকল্পনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

মিনার্ভা থিয়েটার (১৯২২-এর আগুনের পর পুনর্নির্মাণে তাঁর অবদান বিশেষ) এ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন। উল্লেখযোগ্য নাটক ও ভূমিকা:

  • বরুণা (১৯২৩)
  • আত্মদর্শন (১৯২৫) – বিবেকের ভূমিকা
  • সত্যভামা (১৯২৫)
  • তুলসীদাস (১৯২৬)
  • ব্যাপিকা বিদায় (১৯২৬)
  • নর্তকী (১৯২৭)
  • সত্যের সন্ধানে (১৯২৮)
  • জটিচ্যুত (১৯২৮)

স্টার থিয়েটার, রঙ্গমহল, কালিকা প্রভৃতি মঞ্চেও অভিনয় করেন।

চলচ্চিত্রে অভিনয়:

  • নীরব চলচ্চিত্র ইন্দ্রসভা (১৯২৩)
  • যমুনা পুলিনে (১৯৩৩ – প্রথম সবাক চলচ্চিত্র, অভিনয় ও গান)
  • চর দরবেশ
  • আবর্তন (অভিনয় ও সঙ্গীত)
  • কাজী নজরুল ইসলাম পরিচালিত একটি ছবিতে অভিনয়

সম্মাননা

  • ১৯৬৩ সালে ভারত সরকারের সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার (ট্র্যাডিশনাল, ফোক, ট্রাইবাল মিউজিক/ডান্স/থিয়েটার)।
  • কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট. ডিগ্রি।
  • HMV থেকে গোল্ড ডিস্ক

 

আঙুরবালা দেবীর এ্যালবাম

 

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষ দিকে স্ট্রোকের পর স্মৃতিভ্রংশে ভুগছিলেন। কলকাতার দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে তাঁর বাড়ি ‘দ্রাক্ষাকুঞ্জ’ (নাট্যকার অমৃতলাল বসু নামকরণ করেন) আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে। তাঁর ছোট বোন বেদনাবালা (মঞ্চনাম) শেষ জীবনে তাঁর দেখাশোনা করেন।

আঙুরবালা দেবী ৭ জানুয়ারি ১৯৮৪ (কিছু উৎসে ৬ জানুয়ারি) কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর পালিত পুত্র অমল ব্যানার্জী ও পুত্রবধূ শেষ মুহূর্তে পাশে ছিলেন।

তাঁর কণ্ঠ ও অভিনয় আজও বাঙালি সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অমর। তাঁর গান শুনলে সেই সোনালি যুগের স্মৃতি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে—এক অপূর্ব মধুরতার স্মারক। আঙুরবালা দেবীর জীবন ছিল সংগ্রাম, প্রতিভা ও অঙ্গীকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।

Leave a Comment