সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০২৩, ১:৫৫ পিএম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা গানের ভুবনে এক মহান সুর-সৃষ্টিকর্তা এবং রূপকার। প্রচলিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সীমানা পেরিয়ে তিনি বারবার নতুন নতুন রাগের জন্ম দিয়েছেন, যা তাঁর ক্ষুরধার সঙ্গীত প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে। তেমনই এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে তৈরি অনন্য সুন্দর ও করুণ রসের রাগ হলো ‘রাগ আশা ভৈরবী’ (বা আসা ভৈরবী)।
Table of Contents
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে ‘রাগ আশা ভৈরবী’ এক অত্যন্ত বিশেষ ও ঐতিহাসিক সৃষ্টির মর্যাদা পায়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে প্রখ্যাত নাট্যকার জগৎ ঘটক ‘উদাসী ভৈরব’ নামে একটি বেতার নাটিকা রচনা করেন। এই নাটিকাটি ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই নভেম্বর সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। এই বিশেষ নাটিকাটির জন্য মোট ছয়টি গান রচনা করেন এবং সেগুলোতে সুরারোপ করেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
জগৎ ঘটকের নিজস্ব বর্ণনা থেকে জানা যায়, সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী কবিকে ভৈরব রাগের প্রচলিত রূপ এড়িয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু সুরের রূপ সৃষ্টি করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এই অনুরোধে কবি এতটাই মেতে উঠেছিলেন যে, এমনকি ঘুমের মধ্যেও তিনি রাগ-রাগিণীর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এর ফলেই তিনি একে একে অরুণ ভৈরব, উদাসী ভৈরব, রুদ্র ভৈরব এবং এই ‘আশা ভৈরবী’-সহ বেশ কয়েকটি নতুন ভৈরব রাগের উদ্ভাবন করেন।
এমনিতে সঙ্গীতশাস্ত্রে ‘আশা ভৈরবী’ নামে একটি প্রচলিত রাগ রয়েছে, যা নিয়ে পণ্ডিত সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর বিখ্যাত ‘রাগ রূপায়ণ’ গ্রন্থে লিখেছেন—”আশা রাত্রি গেয় এবং উত্তর প্রদেশের আঞ্চলিক সঙ্গীত থেকে গৃহীত। এর সঙ্গে ভৈরবীর মিশ্রণের মধ্যে সঙ্গতি নেই।” সাধারণ হিন্দুস্থানী সঙ্গীতে ‘আশা’ বিলাবল ঠাটের অন্তর্গত একটি রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের রাগ।
তবে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে ‘আশা ভৈরবী’ রাগটি তৈরি করেছেন, তার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এটি মূলত ভৈরবী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। কবি এতে সনাতন ভৈরবীর মিশ্রণ না ঘটিয়ে, একটি বিশেষ স্বরবিন্যাস—‘স-ঋ-জ্ঞ-স’ ব্যবহার করে এক অপূর্ব বৈচিত্র্য এনেছেন। এর ফলে এই রাগে অন্য কোনো রাগের চেনা রূপ পাওয়া যায় না, বরং এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বতন্ত্র একটি রূপ ধারণ করেছে। এই রাগের মূল রস হলো করুণ এবং এর প্রকৃতি অত্যন্ত গম্ভীর।
কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্ট এই রাগের মূল শাস্ত্রীয় কাঠামোটি নিচে তুলে ধরা হলো:
নজরুল সৃষ্ট এই রাগের বিশেষ স্বরবিন্যাস ও করুণ চলনটি স্বরলিপির মাধ্যমে নিচে দেওয়া হলো:
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নিয়ম অনুযায়ী ‘ঋ’ দিয়ে কোমল ঋষভ, ‘জ্ঞ’ দিয়ে কোমল গান্ধার এবং ‘ণ’ ও ‘দ’ দিয়ে যথাক্রমে কোমল নিষাদ ও কোমল ধৈবতের বিশিষ্ট চলনকে নির্দেশ করা হয়েছে।)
কাজী নজরুল ইসলাম নিজে এই রাগের ওপর ভিত্তি করে তাঁর একটি অত্যন্ত গভীর ও আধ্যাত্মিক ভাবসম্পন্ন কালজয়ী গান বেঁধেছিলেন। গানটি হলো:
“মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ আছে শুধু প্রাণ”
রাগ আশা ভৈরবী প্রমাণ করে যে, নজরুল কেবল সুর বাঁধতেন না, সুর নিয়ে খেলা করতে পারতেন। সকালের আলোয় এই রাগের করুণ ও গম্ভীর স্বরলিপি শ্রোতার মনে এক পরম মায়াবী ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির জন্ম দেয়।
নজরুলের এই অসাধারণ সৃষ্টি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
মন্তব্য