রাগ ধনাশ্রী । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

রাগ ধনাশ্রী (অন্যান্য নাম: ধন্নাসিকা, ধানেশ্রী, ধানুশী বা ধানসী) উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের অন্যতম সুপ্রাচীন এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি রাগ। পণ্ডিত অহোবল তাঁর বিখ্যাত ‘সঙ্গীত-পারিজাত’ গ্রন্থের রাগ-প্রকরণ অধ্যায়ে হনুমন্ত মতানুসারে এই রাগের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। সুপ্রাচীন কাল থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম পদাবলী ‘চর্যাপদ’ পর্যন্ত এই রাগের শাস্ত্রীয় ও সুরগত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

সাধারণ পরিচিতি ও শাস্ত্রীয় তথ্যসমূহ

প্রচলিত আধুনিক রূপ অনুযায়ী রাগ ধনাশ্রী কাফি ঠাটের অন্তর্ভুক্ত হলেও চলনের দিক থেকে এতে ভৈরবী অঙ্গের প্রভাবও দেখা যায়। এটি প্রাতঃকাল থেকে শুরু করে অপরাহ্ন পর্যন্ত বিভিন্ন মতে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশিত হতো; তবে আধুনিক শাস্ত্রীয় ধারায় এটি দিবা তৃতীয় প্রহরের রাগ হিসেবে পরিচিত।
বৈশিষ্ট্যবিবরণ
ঠাটের নামকাফি (প্রচলিত) / ভৈরবী (বিশেষ রূপভেদ)
জাতিঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ‘র’ ও ‘ধ’ বর্জিত)
বাদী স্বরপঞ্চম (প)
সংবাদী স্বরষড়জ (স)
অঙ্গউত্তরাঙ্গ প্রধান
গ্রহ স্বরকোমল গান্ধার (জ্ঞ)
ন্যাস স্বরপঞ্চম (প)
গায়ন সময়দিবা তৃতীয় প্রহর (অপরাহ্ন)
প্রকৃতি/রসশান্ত, করুণ ও ধীর-বীর রসাত্মক

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

  • কাফি ঠাটের প্রচলিত ধনাশ্রী:
    • আরোহণ: ণ্ স জ্ঞ ম প ণ র্স
    • অবরোহণ: র্স ণ ধ প ম জ্ঞ র স
    • পকড়: ণ্ স জ্ঞ, ম জ্ঞ প, ধ প জ্ঞ, ম জ্ঞ র স
  • ভৈরব ঠাটের ধনাশ্রী (কোমল ধৈবতযুক্ত):
    • আরোহণ: ণ্ স জ্ঞ ম প ণ র্স
    • অবরোহণ: র্স ণ দ প ম জ্ঞ র স

বিভিন্ন প্রাচীন মতবাদে রাগ ধনাশ্রীর রূপভেদ

প্রাচীন সংগীতশাস্ত্রবিদদের বিভিন্ন ‘মত’ বা শাস্ত্রীয় গ্রন্থে রাগ ধনাশ্রীর ভিন্ন ভিন্ন স্বর-বিন্যাস ও বৈচিত্র্য পাওয়া যায়:

১. হনুমন্ত মত (সঙ্গীত-পারিজাত)

এই মতে ধানশ্রী রাগটি ‘শ্রীরাগের’ পত্নী বা রাগিণী হিসেবে স্বীকৃত। এই মতে স্বরসংখ্যার বিচারে ধানশ্রী রাগের ৩টি জাতি নির্দেশ করা হয়েছে:
  • ষাড়ব-সম্পূর্ণ: আরোহণ (স গ ম প ন র্স) | অবরোহণ (র্স ন ধ প ম গ র স)
  • ষাড়ব-ষাড়ব: আরোহণ (স র গ ম প ন র্স) | অবরোহণ (র্স ন প ম গ র স)
  • ঔড়ব-ঔড়ব: আরোহণ (স গ ম প ন র্স) | অবরোহণ (র্স ন প ম গ র স) — এই রূপটি আধুনিক ‘ধানী’ রাগের সমতুল্য।
  • অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: বাদী স্বর ‘স’, সংবাদী ‘প’, গ্রহ স্বর ‘গ’ এবং গায়নের সময় প্রাতঃকাল।

২. সঙ্গীতরত্নাকর (পণ্ডিত শার্ঙ্গদেব)

‘সঙ্গীতরত্নাকর’ গ্রন্থে এই রাগের নাম ‘ধন্নাসিকা’ এবং এর মেলের নাম ‘চন্দ্রপ্রিয়’।
  • এতে ঋষভ বর্জিত হওয়ায় এর জাতি ষাড়ব-ষাড়ব।
  • এর বাদী স্বর ‘স’, সংবাদী স্বর ‘ম’ এবং ন্যাস স্বর ‘ম’।
  • গান্ধার স্বরটি এখানে খুব কম ব্যবহৃত হয় (অনুবাদী স্বর হিসেবে)। এটি ধীর ও বীর রসের রাগ হিসেবে বর্ণিত।

৩. রাগ-বিবোধ (সোমনাথ) ও শিব মত

‘রাগ-বিবোধ’ গ্রন্থে শিবমত অনুযায়ী এটিকে ‘শ্রী’ মেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই মতে ঋষভ ও ধৈবত স্বর দুটি দুর্বল। ষড়জ (স) স্বরটি একাধারে বাদী, গ্রহ এবং ন্যাস স্বর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পরিবেশন সময় প্রাতঃকাল।

৪. ভরত মত ও কল্পিনাথ মত

  • কল্পিনাথ মত: এই মতে ধনাশ্রীকে ‘মেঘ’ রাগের রাগিণী বলা হয়েছে।
  • ভরত মত: এই মতে এটি শ্রীরাগের ৪র্থ রাগিণী। এতে তীব্র গান্ধার এবং কোমল ঋষভ বক্রভাবে ব্যবহৃত হয় (আরোহণ: স গ ঋ ম ধ প ন র্স)। এতে কড়ি বা তীব্র মধ্যমের ব্যবহার দেখা যায়। এর বাদী স্বর নিষাদ (ন), সংবাদী গান্ধার (গ), গ্রহ স্বর পঞ্চম (প) এবং গায়নের সময় দিবা তৃতীয় প্রহর।

প্রচলিত ধনাশ্রীর রূপতত্ত্ব ও আধুনিক বৈশিষ্ট্য

  • কর্ড ও অঙ্গ বিন্যাস: ‘সঙ্গীত দামোদর’ গ্রন্থে একে মালব রাগের রাগিণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত ধনাশ্রীতে গান্ধার ও নিষাদ কোমল হওয়ায় এটি কাফি ঠাটের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর চলনে ভৈরবী অঙ্গের প্রাবল্য দেখা যায়।
  • আরোহণ ও অবরোহণের রূপ: আরোহণে ঋষভ (র) ও ধৈবত (ধ) বর্জিত হয় বলে এর জাতি ঔড়ব-সম্পূর্ণ।
  • অন্যান্য রাগের সাথে বৈচিত্র্য: এই রাগে মধ্যম (ম) কিছুটা দুর্বল থাকে এবং রাগ ভীমপলশ্রীর সাথে এর স্বরগত সাদৃশ্য রয়েছে। এর একটি বিশেষ কোমল রূপভেদ রয়েছে যার নাম ‘কোমল ধানেশ্রী’। এই রূপটিতে ‘প জ্ঞ, জ্ঞ প’ স্বরসঙ্গতি বেশি প্রয়োগ করা হয়।

বাংলা গান ও চর্যাপদে রাগ ধনাশ্রী (ধানসী)

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রাগ ধনাশ্রীর প্রয়োগ অত্যন্ত প্রাচীন ও সুসংহত। খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে শাস্ত্রীয় রাগের যে ব্যবহার পাওয়া যায়, তার মধ্যে ‘ধানসী’ (বা ধানুশী) অন্যতম।
চর্যাগীতিকোষে ধনাশ্রী (ধানসী) রাগে নিবদ্ধ ১টি পদের সন্ধান পাওয়া যায়:
  • পদ নম্বর ১৪: ডোম্বীপা রচিত পদ— “গঙ্গা জউনা মাঝেঁ রে বহই নাই” (গঙ্গা ও যমুনার মাঝে নৌকা চলে)।
প্রাচীন বাংলা পদাবলী কীর্তন ও লোকসঙ্গীতেও রাগ ধনাশ্রীর আবহ ও সুরকাঠামোর প্রভাব বিস্তৃত।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী

  1. অহোবল। সঙ্গীত-পারিজাত (রাগ-প্রকরণ)।
  2. খান, রাজা নওয়াব আলী। মারিফুন্নাগমাত। অনুবাদ: মকসুদুর রহমান হিলালী। বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
  3. চক্রবর্ত্তী, সুরেশ। রাগ-রূপায়ণ, প্রথম খণ্ড। জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
  4. ভট্টাচার্য, শক্তিপদ। উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত। ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭।
  5. শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৩২৩।
  6. সেন, নীলরতন সম্পাদিত। চর্যাগীতিকোষ। সাহিত্যলোক, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০১।
  7. সেন, সুকুমার। চর্যাগীতি পদাবলী। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৫।
  8. হক, ড. মাহবুবুল। চর্যাগীতি পাঠ। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, জুলাই ২০০৯।
  9. হাই, মুহম্মদ আবদুল ও আনোয়ার পাশা সম্পাদিত। চর্যাগীতিকা। স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা, অগ্রহায়ণ ১৪০২।
  10. ভারতবর্ষ (পত্রিকা)। মাঘ ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯)।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।